স্বপ্নের আড়ালে দীর্ঘশ্বাস: প্রবাস জীবনের অজানা সংগ্রামের গল্প

এয়ারপোর্টে যখন কোনো প্রবাসী বিদায় নেন, তখন তার চোখে থাকে রঙিন স্বপ্ন আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর প্রতিজ্ঞা। কিন্তু সেই স্বপ্নের পেছনের বাস্তবতা সবসময় রঙিন হয় না। প্রবাস জীবনের চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে হাজারো বঞ্চনা, হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আর একাকীত্বের করুণ গল্প। যা অনেক সময় পরিবারের সদস্যরাও জানতে পারেন না।
উচ্চ অভিবাসন ব্যয় ও ঋণের বোঝা বাংলাদেশের একজন সাধারণ কর্মীকে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপে যেতে যে পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়, তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। দালালের খপ্পরে পড়ে অনেকেই ভিটেমাটি বিক্রি করে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। বিদেশে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত বেতন না পাওয়া বা কাজ না থাকার কারণে সেই ঋণ শোধ করতে গিয়েই জীবনের বড় একটা সময় পার হয়ে যায়। অনেক সময় ‘ফ্রি ভিসা’র নামে প্রতারণার শিকার হয়ে মাসের পর মাস বেকার থাকতে হয় তাদের।
অমানবিক কর্মপরিবেশ ও বাসস্থান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা যখন ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে চলে যায়, তখনও বাংলাদেশি শ্রমিকদের খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে হয়। নির্মাণাধীন ভবনের রড মিস্ত্রি বা পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য এই পরিবেশ নরকতুল্য। কর্মঘণ্টার কোনো ঠিক থাকে না অনেক ক্ষেত্রে। ওভারটাইমের লোভ দেখিয়ে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করানো হলেও মাস শেষে ন্যায্য পারিশ্রমিক মেলে না অনেক সময়।
বাসস্থানের সমস্যাও প্রকট। একটি ছোট্ট ঘরে বা ডরমিটরিতে ১০-১২ জন গাদাগাদি করে থাকতে হয়। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং নিম্নমানের খাবার খেয়ে অনেকেই জটিল শারীরিক সমস্যায় ভোগেন। বিশেষ করে ‘গণরুম’ সংস্কৃতি প্রবাসীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
একাকীত্ব ও মানসিক সংকট পরিবার-পরিজন ছেড়ে হাজার মাইল দূরে থাকার কষ্ট কেবল ভুক্তভোগীই জানেন। ঈদের দিন যখন দেশে সবাই আনন্দে মেতে থাকে, তখন একজন প্রবাসীকে হয়তো ডিউটিতে থাকতে হয়। একাকীত্ব, হোম-সিকনেস এবং পরিবারের ছোটখাটো সমস্যার সমাধান দূর থেকে করতে না পারার অক্ষমতা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। অনেক সময় দীর্ঘ বছর প্রবাসে কাটিয়ে দেশে ফেরার পর দেখেন, সন্তান তাকে চিনছে না বা পরিবারের সাথে তার মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এটি একজন মানুষের জন্য চরম ট্র্যাজেডি।
আইনি জটিলতা ও অরক্ষিত জীবন বৈধ কাগজপত্র বা আকামা নবায়ন না হওয়া প্রবাসীদের জন্য এক বড় আতঙ্ক। অনেক সময় নিয়োগকর্তা (কফিল) ইচ্ছে করে আকামা নবায়ন করেন না, ফলে শ্রমিক অবৈধ হয়ে পড়েন। তখন পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়। চিকিৎসা সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হন তারা। অসুস্থ হলে হাসপাতালে যাওয়ার সাহস পান না ধরা পড়ার ভয়ে।
প্রবাসীদের এই সংগ্রামের গল্পগুলো আমাদের অর্থনীতির ভিত মজবুত করছে ঠিকই, কিন্তু তাদের জীবনের এই করুণ অধ্যায়গুলো কি আমরা মনে রাখি? রেমিট্যান্সের সংখ্যার চেয়ে এই মানুষগুলোর মানবিক মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।











