নভেম্বর ৯, ২০২৬
#নারী প্রবাসী #প্রিয় বাংলাদেশ #শীর্ষ নিউজ

রেমিট্যান্স যোদ্ধার সারিতে নারী: সততা আর সাহসিকতার এক নতুন অধ্যায়

এক সময় প্রবাস মানেই ছিল পুরুষের জগত। কিন্তু গত এক দশকে এই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পুরুষদের পাশাপাশি সমান তালে লড়ে যাচ্ছেন নারী প্রবাসীরা। মধ্যপ্রাচ্যের গৃহকর্মী থেকে শুরু করে ইউরোপ-আমেরিকার কর্পোরেট জগত—সবখানেই বাংলাদেশি নারীদের পদচারণা বাড়ছে। তবে তাদের এই যাত্রাপথ কখনোই মসৃণ ছিল না।

শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১০ লাখেরও বেশি নারী কর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এর বড় একটি অংশ কাজ করছেন সৌদি আরব, জর্ডান, লেবানন ও ওমানে গৃহকর্মী হিসেবে। এছাড়া জর্ডান ও মরিশাসের পোশাক শিল্পে বাংলাদেশি নারীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাদের পাঠানো অর্থ গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। অনেক নারী এখন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পেশাদার খাতে নারীর উত্থান শুধুমাত্র গৃহকর্মী বা শ্রমিক হিসেবে নয়, দক্ষ পেশাজীবী হিসেবেও বাংলাদেশি নারীরা বিদেশে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি নারী ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক ও নার্সদের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে মালদ্বিপ ও কুয়েতে বাংলাদেশি নারী নার্সদের বেশ সুনাম রয়েছে। তারা প্রমাণ করেছেন, সুযোগ পেলে মেধার স্বাক্ষর রাখতে বাংলাদেশি নারীরা কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই।

নিরাপত্তা ও চ্যালেঞ্জ তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া নারীদের অনেকেই ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বেতন না দেওয়া, এবং পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়ার অভিযোগ প্রায়ই সংবাদ শিরোনামে আসে। অনেক ক্ষেত্রে দালালরা ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের পাচার করে দেয় বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করে। নির্যাতনের সইতে না পেরে অনেক নারী কর্মী দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন, কেউ কেউ বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। ট্রাভেল পাস নিয়ে শূন্য হাতে ফেরা নারীদের পুনর্বাসন সমাজের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ প্রবাসে কাজ করা নারীদের প্রতি আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এখনো পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। একজন পুরুষ বিদেশ থেকে ফিরলে তাকে যেভাবে সম্মানিত করা হয়, একজন নারী কর্মীর ক্ষেত্রে অনেক সময় উল্টোটা ঘটে। অথচ তাদের পাঠানো কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রাই দেশের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে।

সরকার বর্তমানে নারী কর্মীদের সুরক্ষায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিদেশে যাওয়ার আগে তাদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপের মাধ্যমে তাদের ডাটাবেজ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, গৃহকর্মীর কাজের চেয়ে নারীদের দক্ষ পেশায় (যেমন—গার্মেন্টস, নার্সিং, কেয়ারগিভিং) বিদেশে পাঠানোর দিকে বেশি নজর দেওয়া উচিত। এতে তাদের নিরাপত্তা যেমন বাড়বে, তেমনি আয়ের পথও সুগম হবে।

সংগ্রাম আর সাফল্যের মিশেলে বাংলাদেশি নারী প্রবাসীরা আজ অদম্য। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *