বিশ্বকাপ-পরবর্তী কাতার: বদলে যাওয়া শ্রমবাজার ও বাংলাদেশি প্রবাসীদের ভবিষ্যৎ

২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের জৌলুস বিশ্ববাসী দেখেছে, কিন্তু সেই জৌলুসের পেছনের কারিগর ছিলেন লাখো প্রবাসী শ্রমিক, যার একটি বিশাল অংশ বাংলাদেশি। কাতারের আকাশছোঁয়া স্টেডিয়াম, মেট্রো রেল, আর ঝকঝকে রাস্তাঘাট নির্মাণে মিশে আছে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ঘাম। তবে বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর কাতারের শ্রমবাজারে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। নির্মাণ কাজের চাপ কমলেও সেবা খাতে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা।
বিশ্বকাপের কারিগর ও বর্তমান বাস্তবতা সরকারি হিসেবে কাতারে প্রায় ৪ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করেন। এতদিন এদের প্রধান কর্মক্ষেত্র ছিল নির্মাণ খাত। কিন্তু বিশ্বকাপ-পরবর্তী সময়ে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ কমে যাওয়ায় অনেক নির্মাণ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। কেউ কেউ দেশে ফিরেছেন, আবার কেউ কেউ নতুন কাজের সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরছেন। তবে আশার কথা হলো, কাতার সরকার এখন পর্যটন ও হসপিটালিটি সেক্টরে জোর দিচ্ছে। ফলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, লিমুজিন সার্ভিস এবং শপিং মলগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
শ্রম আইন সংস্কার ও সুযোগ-সুবিধা কাতার মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে বিতর্কিত ‘কাফালা’ (স্পন্সরশিপ) প্রথা অনেকটাই শিথিল করেছে। বর্তমানে তাত্ত্বিকভাবে শ্রমিকরা তাদের নিয়োগকর্তার অনুমতি (NOC) ছাড়াই চাকরি পরিবর্তন করতে পারেন। এছাড়া মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১০০০ রিয়াল নির্ধারণ করা হয়েছে, সাথে আবাসন ও খাবারের ভাতা বাধ্যতামূলক। এই আইনগুলো বাংলাদেশি শ্রমিকদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। তবে প্রবাসীদের অভিযোগ, অনেক কোম্পানি এখনো এই আইন পুরোপুরি মানছে না। বেতন বকেয়া থাকা এবং কাজের শেষে বেনিফিট না পাওয়ার অভিযোগ এখনো পাওয়া যায়।
জীবিকার সংগ্রাম ও উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয় দোহাসহ কাতারের প্রধান শহরগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেশ বেশি। বিশেষ করে বিশ্বকাপ ঘিরে বাসা ভাড়ার যে ঊর্ধ্বগতি ছিল, তা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সাধারণ শ্রমিকদের আয়ের বড় অংশ চলে যায় থাকা-খাওয়ার খরচে। অনেকেই দলবেঁধে শহরের উপকণ্ঠের ‘লেবার ক্যাম্প’ বা ‘সানাইয়া’ এলাকায় গাদাগাদি করে থাকেন।
রেমিট্যান্স প্রবাহে অবদান চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও কাতার থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় কোনো ধস নামেনি। বরং দক্ষ কর্মীরা এখন ভালো বেতন পাচ্ছেন। কাতারের বাংলাদেশি কমিউনিটি বেশ শক্তিশালী এবং সংগঠিত। তারা মনে করেন, বাংলাদেশ সরকার যদি কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে কাতারের উদীয়মান সেক্টরগুলোতে (যেমন—সিকিউরিটি সার্ভিস, ড্রাইভিং, সেলসম্যান) কোটা নিশ্চিত করতে পারে, তবে কাতার বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং স্থিতিশীল একটি শ্রমবাজার হতে পারে।











