কড়া আইনের দেশে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি: সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রবাসীদের যাপিত জীবন

পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল এবং আইনের শাসনে কঠোর—সিঙ্গাপুর সারা বিশ্বের কাছে এক বিস্ময়। আর এই জৌলুসপূর্ণ নগর রাষ্ট্রটি গড়ে তোলার পেছনে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে স্যান্ডস থেকে শুরু করে বড় বড় আবাসন প্রকল্প (HDB), সবখানেই মিশে আছে বাংলাদেশি নির্মাণ শ্রমিকদের স্পর্শ। তবে চাকচিক্যের আড়ালে এখানকার প্রবাসীদের জীবন কাটে কঠোর নিয়ম আর হাড়ভাঙ্গা খাটুনির মধ্যে।
নির্মাণ ও মেরিন খাতের প্রধান শক্তি সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশিদের সিংহভাগই কাজ করেন কনস্ট্রাকশন (নির্মাণ) এবং মেরিন শিপইয়ার্ড সেক্টরে। এখানকার শ্রমবাজার বেশ কাঠামোগত। বাংলাদেশ থেকে আসার আগেই শ্রমিকদের বিসিএ (BCA) বা স্কিল ট্রেনিং নিয়ে আসতে হয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় এখানকার শ্রমিকরা অপেক্ষাকৃত দক্ষ এবং তাদের বেতনও কিছুটা ভালো। ওভারটাইমসহ একজন শ্রমিক মাসে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন, যা তাদের পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে বড় ভূমিকা রাখে।
কঠোর আইন ও নিরাপত্তা সিঙ্গাপুরের শ্রম আইন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত কড়া। কর্মক্ষেত্রে সেফটি হেলমেট, বুট এবং হারনেস পরা বাধ্যতামূলক। সামান্য ভুলে বড় ধরনের জরিমানা বা চাকরি হারানোর ভয় থাকে। এই কড়া অনুশাসনের কারণে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার হার কম হলেও কাজের চাপ থাকে প্রচণ্ড। রোদে পুড়ে বা বৃষ্টিতে ভিজে টানা কাজ করা এখানকার শ্রমিকদের নিত্যদিনের রুটিন।
ডরমিটরি জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্য সিঙ্গাপুরে শ্রমিকদের থাকার জন্য নির্ধারিত ‘ডরমিটরি’ ব্যবস্থা রয়েছে। করোনার পর থেকে ডরমিটরিগুলোর পরিবেশ কিছুটা উন্নত হলেও, একঘেয়ে জীবন এবং পরিবারের সাথে দীর্ঘদিন দেখা না হওয়ায় অনেকেই মানসিক অবসাদে ভোগেন। কড়া নিয়মের কারণে কাজের বাইরে ঘোরাফেরা বা বিনোদনের সুযোগ খুব সীমিত। রবিবার বা ছুটির দিনে মোস্তফা সেন্টার বা লিটল ইন্ডিয়া এলাকায় জড়ো হয়ে প্রবাসীরা একে অপরের সাথে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেন।
স্থায়ী হওয়ার সুযোগ নেই ইউরোপ বা আমেরিকার মতো সিঙ্গাপুরে দীর্ঘদিন কাজ করলেও নাগরিকত্ব বা পিআর (PR) পাওয়ার সুযোগ সাধারণ শ্রমিকদের জন্য নেই বললেই চলে। ১০-১৫ বছর কাজ করার পর, শরীর যখন আর চলে না, তখন তাদের দেশে ফিরে আসতেই হয়। তাই এখানকার প্রবাসীরা সবসময় চেষ্টা করেন যত দ্রুত সম্ভব টাকা জমিয়ে দেশে কিছু করার।
সিঙ্গাপুর প্রবাসীরা বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম বিশ্বস্ত উৎস। তাদের পাঠানো অর্থ সম্পূর্ণ ব্যাংকিং চ্যানেলে আসে, যা দেশের রিজার্ভের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাদের জীবনের শেষ বয়সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেনশন স্কিম বা পুনর্বাসন নিয়ে সরকারের ভাবার অবকাশ রয়েছে।











