রেসিডেন্ট কার্ড হাতে পেয়েও ফেরা হলো না দেশে, কর্মস্থলে প্রাণ হারালেন সিলেটের কামরুল ইসলাম

সিলেটের জগন্নাথপুর উপজেলার হরিয়রপুর গ্রামের আব্দুল মালিকের পুত্র কামরুল ইসলাম (প্রায় ৩০) ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল তিনটার দিকে পর্তুগালের মাদেইরা শহরে কর্মরত অবস্থায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। ফেসবুক সূত্রে জানা যায়, কাজ শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি সিমেন্টের বস্তা মাথায় পড়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রবাসে নতুন স্বপ্নের সূচনা করেছিলেন কামরুল ইসলাম। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও নানা প্রশাসনিক জটিলতা পেরিয়ে তিনি সদ্য রেসিডেন্ট কার্ড হাতে পান। পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে দেশে ফিরে দেখা করার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার আনন্দ ম্লান হয়ে গেল এক মুহূর্তেই।
সহকর্মীদের বরাত দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যে জানা গেছে, ৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরের পর তিনি মাদেইরার একটি নির্মাণস্থলে কাজে যোগ দেন। বিকেল তিনটার দিকে উপর থেকে একটি ভারী সিমেন্টের বস্তা ছিটকে পড়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে। গুরুতর আঘাতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি তদন্ত করছে।
এদিকে তার গ্রামের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। হরিয়রপুরে কামরুলের পরিবার অপেক্ষায় ছিল তাঁর দেশে ফেরার। প্রতিবেশীরা জানান, পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় কয়েক বছর আগে তিনি ইউরোপে পাড়ি জমান। প্রবাসজীবনের কষ্ট সহ্য করে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান তৈরি করছিলেন। রেসিডেন্ট কার্ড পাওয়ার খবরটি পরিবারে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছিল। সেই আলো নিভে গেল আকস্মিক দুর্ঘটনায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কামরুল ইসলাম পরিবারের বড় সন্তান। বৃদ্ধ পিতা-মাতা এবং ভাইবোনদের দায়িত্ব তার কাঁধেই ছিল। নিয়মিত দেশে অর্থ পাঠিয়ে সংসার চালাতে সহায়তা করতেন। তার মৃত্যুতে পরিবারটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
পর্তুগালে বাংলাদেশ দূতাবাস এক শোকবার্তায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মরদেহ দেশে পাঠানো এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
নির্মাণখাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ নতুন নয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শ্রমিকরা প্রায়ই ভারী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে কাজ করেন। নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও তদারকির ঘাটতি থাকলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, মানসম্মত হেলমেট ও সুরক্ষা ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এ ধরনের দুর্ঘটনা কমানো কঠিন।
ঘটনার মূল তথ্যগুলো এক নজরে:
নিহত: কামরুল ইসলাম, পিতা আব্দুল মালিক
বাড়ি: হরিয়রপুর গ্রাম, জগন্নাথপুর, সিলেট
তারিখ ও সময়: ৪ ফেব্রুয়ারি, বিকেল ৩টা
স্থান: মাদেইরা শহর, পর্তুগাল
কারণ: নির্মাণস্থলে সিমেন্টের বস্তা মাথায় পড়ে মৃত্যু
অবস্থা: সদ্য রেসিডেন্ট কার্ডপ্রাপ্ত প্রবাসী শ্রমিক
প্রবাসে জীবনমান উন্নয়নের স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছাড়েন হাজারো তরুণ। তাঁদের রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ মাঝে মাঝে সেই স্বপ্নকে রক্তাক্ত করে তোলে। কামরুল ইসলামের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
পরিবারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—প্রিয়জনের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঠিক কারণ উদঘাটন।











