কাতারের এলএনজি উৎপাদন স্থগিত: ইউরোপে দাম বাড়লো ৫০ শতাংশ

মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাসা পরিস্থিতিতে এবার বড় ধরনের আঘাত এল বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের জেরে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে কাতার এনার্জি।
আর এই এক ঘোষণাতেই কেপে উঠেছে বিশ্ব অর্থনীতি—বিশেষ করে ইউরোপের পাইকারি বাজারে গ্যাসের দাম একলাফে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
সংঘাতের ছায়া জ্বালানি খাতে
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক দেশ কাতার সোমবার (২ মার্চ) আকস্মিকভাবে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত করে। কাতার এনার্জি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে চালানো হামলার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তারা এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা কেবল ভূ-রাজনীতিতে নয়, বরং সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্পকারখানার জ্বালানি সরবরাহেও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ইউরোপ ও এশিয়ায় রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি
কাতার এনার্জির এই ঘোষণার প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক এবং বিধ্বংসী। সোমবার দিনের শুরুতে ইউরোপে গ্যাসের দাম ২৫ শতাংশ বাড়লেও, বেলা বাড়ার সাথে সাথে তা ৫০ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। ইউরোপীয় গ্যাসের বেঞ্চমার্ক হিসেবে পরিচিত ডাচ টি-টিএফ (TTF) হাবে ফ্রন্ট-মান্থ চুক্তির মূল্য ১৪.৫৬ ইউরো বেড়ে প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় ৪৬.৫২ ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন ডলারে যা প্রতি এমএমবিটিইউ-তে প্রায় ১৫.৯২ ডলার।
কেবল ইউরোপ নয়, আগুনের আঁচ লেগেছে এশিয়ার বাজারেও। এশিয়ার এলএনজি মূল্য নির্ধারণের প্রধান সূচক এস অ্যান্ড পি গ্লোবালের জাপান-কোরিয়া মার্কার (JKM)-এর দাম সোমবার সকালে ৩৯ শতাংশ লাফিয়ে প্রতি এমএমবিটিইউ-তে ১৫.০৬৮ ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দামের এমন উল্লম্ফন সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল।
একনজরে বর্তমান জ্বালানি বাজারের চিত্র:
ইউরোপীয় বাজার (TTF): দাম বেড়েছে ৫০%, প্রতি এমডব্লিউএইচ-এর বর্তমান মূল্য ৪৬.৫২ ইউরো।
এশীয় বাজার (JKM): ৩৯% মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রতি এমএমবিটিইউ ১৫.০৬৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
উৎপাদন বন্ধের কারণ: কাতারে ইরানের হামলাজনিত নিরাপত্তা ঝুঁকি।
প্রভাব: কাতার বিশ্বের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক হওয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও সংকট বিশ্লেষণ
১৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে বহু টানাপোড়েন দেখলেও, এলএনজি বাজারের এই অস্থিরতা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। কাতার থেকে সরবরাহ বন্ধ হওয়া মানে হচ্ছে ইউরোপের দেশগুলোর জন্য বিকল্প খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়া। শীতকাল শেষ হতে চললেও শিল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য গ্যাসের এই আকাশচুম্বী দাম মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এটি একটি অশনিসংকেত। স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কেনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে, যা পরোক্ষভাবে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।










