কেন পম্পেউ ফাবরা বিশ্ববিদ্যালয় আজ বিশ্বসেরাদের কাতারে?

ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত স্পেনের কাতালোনিয়া অঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বার্সেলোনা কেবল ফুটবল বা স্থাপত্যের জন্য নয়, বরং উচ্চশিক্ষার এক অনন্য তীর্থস্থান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত পম্পেউ ফাবরা বিশ্ববিদ্যালয় (Pompeu Fabra University – UPF) মাত্র তিন দশকের ব্যবধানে আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্বজুড়ে এক বিস্ময়কর বিপ্লব ঘটিয়েছে। প্রথাগত ঐতিহ্যের চেয়ে উদ্ভাবনী শক্তিতে বলীয়ান এই প্রতিষ্ঠানটি এখন বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার মানদণ্ড নির্ধারণ করছে।
সাধারণত একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে পৌঁছাতে শত বছরের ঐতিহ্যের প্রয়োজন হয়। কিন্তু পম্পেউ ফাবরা সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। কাতালান ভাষার সংস্কারক পম্পেউ ফাবরার নামে নামাঙ্কিত এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বিশ্বের সেরা ‘তরুণ’ (৫০ বছরের কম বয়সী) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। এর সাফল্যের মূলে রয়েছে গৎবাঁধা সিলেবাসের বাইরে গিয়ে যুগের সাথে তাল মেলানোর ক্ষমতা এবং কঠোর অ্যাকাডেমিক শৃঙ্খলা।
বিশ্ববিদ্যালয়টি মূলত তিনটি প্রধান ক্যাম্পাসে বিভক্ত: সামাজিক ও মানবিক অনুষদ, স্বাস্থ্য ও জীবন বিজ্ঞান, এবং যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি। বার্সেলোনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই ক্যাম্পাসগুলো কেবল শিক্ষার কেন্দ্র নয়, বরং একেকটি আধুনিক উদ্ভাবনী গবেষণাগার। বিশেষ করে এর ‘পবলো নৌ’ (Poblenou) ক্যাম্পাসটি বর্তমানে ইউরোপের ডিজিটাল মিডিয়া ও আইটি হাব হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
পম্পেউ ফাবরার অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে কাজ করছে তাদের আন্তর্জাতিক সংযোগ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং বিপুল সংখ্যক শিক্ষক আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে আসা। ফলে এখানে একটি বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের গ্লোবাল থিংকিং বা বৈশ্বিক চিন্তাধারায় অভ্যস্ত করে তোলে। অর্থনীতি ও ব্যবসায় প্রশাসনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি এখন আকাশচুম্বী; তাদের ‘বার্সেলোনা স্কুল অফ ইকোনমিকস’ প্রোগ্রামটি বিশ্বজুড়ে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কেন এটি সেরা পছন্দ?
উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে সাধারণত উত্তর আমেরিকা বা যুক্তরাজ্য প্রধান পছন্দে থাকলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্সেলোনার এই বিশ্ববিদ্যালয়টি দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
১. সাশ্রয়ী শিক্ষা ও স্কলারশিপ: ইউরোপের অন্যান্য নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এখানে টিউশন ফি বেশ সহনীয়। এছাড়া ‘Erasmus+’ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের মাধ্যমে বাংলাদেশি মেধাবী শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ পেতে পারেন।
২. ইংরেজি মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা: ভাষা নিয়ে ভীতি থাকলেও পম্পেউ ফাবরার অধিকাংশ স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি প্রোগ্রাম ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় সুবিধা।
৩. গবেষণা ও ক্যারিয়ার: যারা ডেটা সায়েন্স, মিডিয়া স্টাডিজ বা বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ নিয়ে কাজ করতে চান, তাদের জন্য এখানকার ল্যাবগুলো বিশ্বমানের। ডিগ্রি শেষে ইউরোপের শ্রমবাজারে প্রবেশের পথও এখান থেকে সহজ হয়।
৪. অনুকূল আবহাওয়া: উত্তর ইউরোপের তীব্র শীতের তুলনায় বার্সেলোনার রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য মানিয়ে নেওয়া অনেক সহজ।
একনজরে পম্পেউ ফাবরা বিশ্ববিদ্যালয়:
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৯৯০ সাল।
শিক্ষার্থী সংখ্যা: প্রায় ১৫,০০০ (স্নাতক ও স্নাতকোত্তর মিলিয়ে)।
বৈশ্বিক অবস্থান: বিশ্বের সেরা ২০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিয়মিত অবস্থান এবং স্পেনের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
অনুষদ: ৮টি অনুষদ এবং ৩টি প্রধান ক্যাম্পাস।
গবেষণার মান: ইউরোপীয় গবেষণা কাউন্সিল (ERC) থেকে অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি অন্যতম সফল প্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) যুগে পম্পেউ ফাবরা তাদের শিক্ষা পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনছে। তারা কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা শেখানোর ওপর জোর দিচ্ছে।
পম্পেউ ফাবরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রমাণ করেছে যে, দীর্ঘ ইতিহাস না থাকলেও কেবল সদিচ্ছা এবং গবেষণার প্রতি একাগ্রতা থাকলে বিশ্বজয়ী হওয়া সম্ভব।











