করপোরেট লিডার তৈরিতে কেন অনন্য ফরাসি বিজনেস স্কুল ‘ইনসিয়াড’?

বিশ্বের বাঘা বাঘা কোম্পানির সিইও কিংবা প্রভাবশালী নীতি-নির্ধারকদের নামের পাশে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রায়ই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ‘ইনসিয়াড’ (INSEAD)। ১৯৫৭ সালে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ফনটেইনব্লু শহরে প্রতিষ্ঠিত এই বিজনেস স্কুলটি বর্তমানে কেবল ইউরোপের নয়, বরং সারা বিশ্বের ব্যবসায়িক শিক্ষার এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ইনসিয়াড-এর বিশেষত্ব হলো এর ‘মাল্টি-ক্যাম্পাস’ কাঠামো। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অদূরে ফনটেইনব্লু-র সবুজ অরণ্যে এর মূল ক্যাম্পাস হলেও, সিঙ্গাপুর, আবুধাবি এবং সান ফ্রান্সিসকোতে এর শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের জাতীয়তা বহন করে না, বরং এর প্রতিটি ক্লাসরুমে বিশ্বের অন্তত ১০০টি দেশের মেধাবীদের সমাগম ঘটে। ফলে এখান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা কেবল ডিগ্রি পান না, বরং পান এক বিশাল বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক।
হার্ভার্ড বা স্ট্যানফোর্ডের মতো মার্কিন বিজনেস স্কুলগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রোগ্রামের বিপরীতে ইনসিয়াড প্রবর্তন করেছে ১০ মাসের নিবিড় এমবিএ (MBA) প্রোগ্রাম। সময় কম হলেও এর গভীরতা এবং পরিশ্রমের মাত্রা এতটাই বেশি যে, একে প্রায়ই করপোরেট জগতের ‘বুট ক্যাম্প’ বলা হয়। উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা মনোভাব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা—এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ইনসিয়াড তৈরি করছে আগামীর নেতৃত্ব।
‘ফাইনান্সিয়াল টাইমস’ এবং ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং’-এ ইনসিয়াড নিয়মিতভাবে বিশ্বের সেরা তিনটি বিজনেস স্কুলের মধ্যে নিজের স্থান ধরে রাখে। এখানকার শিক্ষা পদ্ধতি মূলত ‘কেস স্টাডি’ নির্ভর। শিক্ষার্থীরা কেবল বইয়ের তাত্ত্বিক বিদ্যা শেখেন না, বরং তারা সরাসরি বাস্তব জীবনের জটিল ব্যবসায়িক সংকটের সমাধান খোঁজেন।
ইনসিয়াড-এর অ্যালুমনাই নেটওয়ার্ক বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি। প্রায় ১৬৬টি দেশে বিস্তৃত ৬৫ হাজারের বেশি প্রাক্তন শিক্ষার্থী আজ টেক জায়ান্ট থেকে শুরু করে স্টার্টআপ—সবখানেই নীতিনির্ধারকের ভূমিকায় রয়েছেন। বিশেষ করে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন এবং টেকসই ব্যবসায়িক মডেল তৈরিতে ইনসিয়াড-এর গবেষকরা আন্তর্জাতিকভাবে পথ দেখাচ্ছেন।
একনজরে ইনসিয়াড (INSEAD) বিজনেস স্কুল:
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৯৫৭ সাল (ফ্রান্স)।
ক্যাম্পাস: ফনটেইনব্লু (ফ্রান্স), সিঙ্গাপুর, আবুধাবি এবং সান ফ্রান্সিসকো (যুক্তরাষ্ট্র)।
শিক্ষার্থী বৈচিত্র্য: প্রতি ব্যাচে ১০০টির বেশি দেশের শিক্ষার্থী।
র্যাঙ্কিং: ফাইনান্সিয়াল টাইমস-এর গ্লোবাল এমবিএ র্যাঙ্কিংয়ে একাধিকবার শীর্ষস্থান অর্জন।
বিশেষত্ব: দ্রুততম ১০ মাসের এমবিএ প্রোগ্রাম এবং বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি।
ক্যারিয়ার প্রভাব: গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার তিন মাসের মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী আকর্ষণীয় বেতনে নিয়োগ পান।
আরও পড়ুনঃ পরবাসে নিজের ভাষায় বাংলাদেশি ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সহজ পথ
বাংলাদেশের উদীয়মান করপোরেট পেশাজীবী এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ইনসিয়াড হতে পারে ক্যারিয়ারের এক শক্তিশালী মোড়। যদিও এখানকার টিউশন ফি কিছুটা আকাশছোঁয়া, তবে মেধার বিচারে ইনসিয়াড প্রচুর পরিমাণে স্কলারশিপ প্রদান করে থাকে। বিশেষ করে নারী নেতৃত্ব এবং উন্নয়নশীল দেশের মেধাবীদের জন্য তাদের বিশেষ ফান্ডিং সুবিধা রয়েছে।
বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির এই সময়ে ইনসিয়াড-এর মতো প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি অর্জন করা একজন শিক্ষার্থীর জন্য গ্লোবাল মার্কেটে প্রবেশের সুযোগ অবারিত করে দেয়। এখানকার বহুমুখী সংস্কৃতিতে খাপ খাইয়ে নিতে পারা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ, কারণ এখানকার পরিবেশ অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ এবং উন্মুক্ত।











