কেন ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটে ‘এইচইসি প্যারিস’ অনন্য?

প্যারিসের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে, জুয়ি-এন-জোফাসের শান্ত সবুজে ঘেরা ৩০০ একরের একটি ক্যাম্পাস আজ বিশ্ব রাজনীতির অলিন্দ থেকে করপোরেট বোর্ডের শীর্ষ সভা, সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ১৮৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘এইচইসি প্যারিস’ (HEC Paris) কেবল একটি বিজনেস স্কুল নয়, বরং এটি ফরাসি আভিজাত্য আর আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতির এক অনন্য মেলবন্ধন। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি এমন সব নেতৃত্ব তৈরি করেছে, যারা বর্তমান বিশ্বের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক মানচিত্রকে প্রতিনিয়ত নতুন রূপ দিচ্ছেন।
এইচইসি প্যারিসের বিশেষত্ব হলো এর কঠোর মেধা যাচাই ও প্রগতিশীল পাঠদান পদ্ধতি। ইউরোপের ‘গ্রঁদ একোল’ (Grandes Écoles) ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর ধরে ‘ফাইনান্সিয়াল টাইমস’ র্যাঙ্কিংয়ে ইউরোপের সেরা বিজনেস স্কুল হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত রেখেছে। এখানকার এমবিএ (MBA) এবং মাস্টার্স ইন ম্যানেজমেন্ট (MiM) প্রোগ্রামগুলো বিশ্বজুড়ে এতটাই সমাদৃত যে, একজন শিক্ষার্থীর সিভিতে এইচইসি-র নাম থাকা মানেই হলো সফল ক্যারিয়ারের শতভাগ নিশ্চয়তা।
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার মূল দর্শন হলো ‘লার্ন টু ডেয়ার’ বা সাহস করতে শেখো। কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং বাস্তব জীবনের জটিল সংকট মোকাবিলায় একজন শিক্ষার্থী কতটা উদ্ভাবনী হতে পারেন, সেটিই এখানে হাতে-কলমে শেখানো হয়। এখানকার ক্লাসরুমগুলোতে ১০০টিরও বেশি দেশের মেধার মিলন ঘটে, যা শিক্ষার্থীদের এক বিশাল আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের অংশ করে তোলে।
আরও পড়ুনঃ পরবাসে নিজের ভাষায় বাংলাদেশি ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সহজ পথ
এইচইসি প্যারিস কেন অনন্য, তার প্রমাণ মেলে এর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের তালিকার দিকে তাকালে। ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলঁদ থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত কোম্পানি ‘লরিয়াল’, ‘কেরিং’ কিংবা ‘বেস্ট বাই’-এর প্রধান নির্বাহীরা এই চত্বর থেকেই নিজেদের গড়ে তুলেছেন। এটি এমন এক প্রতিষ্ঠান যা বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সিইও তৈরি করার তালিকায় নিয়মিতভাবে হার্ভার্ড বা স্ট্যানফোর্ডের সাথে পাল্লা দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়টির ডিজিটাল রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বর্তমান গবেষণাগুলো বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। তারা বিশ্বাস করে যে, আগামী দিনের লিডারদের কেবল ব্যালেন্স শিট বুঝলে চলবে না, বরং তাদের প্রযুক্তি আর নৈতিকতার মেলবন্ধন ঘটাতে হবে। এই দূরদর্শী চিন্তাই এইচইসি-কে অন্যদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে রেখেছে।
একনজরে এইচইসি প্যারিস (HEC Paris):
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৮৮১ সাল (প্যারিস চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্তৃক)।
অবস্থান: জুয়ি-এন-জোফাস (প্যারিসের অদূরে), ফ্রান্স।
র্যাঙ্কিং: ইউরোপের ১ নম্বর বিজনেস স্কুল (ফাইনান্সিয়াল টাইমস)।
অ্যালুমনাই নেটওয়ার্ক: ১০৫টি দেশে ৭০ হাজারেরও বেশি প্রভাবশালী সদস্য।
বিশেষত্ব: ফরচুন ৫০০ কোম্পানিগুলোর সিইও তৈরির ক্ষেত্রে ইউরোপের শীর্ষে।
উদ্ভাবন হাব: ক্যাম্পাসে অবস্থিত ‘স্টেশন এফ’ (Station F) অংশীদারিত্বের মাধ্যমে স্টার্টআপ সংস্কৃতিতে বিপ্লব।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে আমাদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের এই সময়ে এইচইসি প্যারিস হতে পারে এদেশের মেধাবী সন্তানদের জন্য এক স্বপ্নের গন্তব্য। যদিও এখানকার ভর্তি প্রক্রিয়া অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক, তবুও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি অবারিত সুযোগ।
বিশ্ববিদ্যালয়টি মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রচুর পরিমাণে স্কলারশিপ প্রদান করে থাকে। বিশেষ করে যারা টেকসই উন্নয়ন এবং সোশ্যাল বিজনেস নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী, তাদের জন্য এইচইসি-র বিশেষ ফান্ডিং সুবিধা রয়েছে। এখানকার বহুমুখী সংস্কৃতিতে খাপ খাইয়ে নিতে পারা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ, কারণ প্রতিষ্ঠানটি বৈচিত্র্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।











