রেমিট্যান্স শাটডাউন: অর্থনীতির ফুসফুসে টান ধরলে কতটা ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে যদি কোনো কারণে স্থবিরতা নেমে আসেযাকে বিশ্লষকরা ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’ বলছেন তবে তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের নাজুক সময়ে প্রবাসীদের টাকা পাঠানো বন্ধ হওয়া মানে হলো জাতীয় অর্থনীতির ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হওয়ার শামিল, যার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা পর্যন্ত।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ যে বিস্ময়কর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, তার অন্যতম কারিগর আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’ বা বৈধ পথে টাকা না পাঠানোর যে ডাক মাঝেমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়, তা দেশের অর্থনীতির জন্য এক অশনি সংকেত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষা এবং আমদানির দায় মেটানোর জন্য যে ডলারের প্রয়োজন হয়, তার সিংহভাগ যোগান দেয় এই প্রবাসীদের রক্ত পানি করা পরিশ্রমের অর্থ।
আরও পড়ুনঃ সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সতর্কবার্তা, জেনে নিন প্রয়োজনে যোগাযোগের নম্বর!
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ বন্ধ বা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেলে প্রথম আঘাত আসবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। রিজার্ভ কমলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ঋণমান (Credit Rating) কমে যায়। ফলে জ্বালানি তেল, সার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য এলসি (Letter of Credit) খোলা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং খাদ্য সরবরাহের ওপর, যা প্রকারান্তরে বাজারে অগ্নিমূল্য তৈরি করবে।
দ্বিতীয়ত, রেমিট্যান্স কেবল সংখ্যা নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। দেশের কোটি মানুষের জীবনযাত্রা সরাসরি প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল। রেমিট্যান্স শাটডাউনের ফলে তৃণমূল পর্যায়ে অর্থের প্রবাহ কমে গেলে গ্রামীণ ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়বে। জমি কেনাবেচা, গৃহনির্মাণ এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্পে যে বিনিয়োগ প্রবাসীরা করেন, তা বন্ধ হয়ে গেলে বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে দীর্ঘমেয়াদে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
তবে শাটডাউন বা বয়কটের এই সংস্কৃতি প্রবাসীদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। বৈধ পথ ছেড়ে হুন্ডির মতো অবৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠালে সেই অর্থের কোনো আইনি সুরক্ষা থাকে না। অন্যদিকে, রাষ্ট্র যখন ডলার সংকটে ভোগে, তখন মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটে, যার ফলে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এটি একটি চক্রাকার সংকট, যেখানে শেষ পর্যন্ত দেশের সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীর পরিবারগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রেমিট্যান্স শাটডাউন হলে সম্ভাব্য ৫টি বড় সংকট:
রিজার্ভে ধস: বৈদেশিক মুদ্রার মজুত দ্রুত কমে যাবে, ফলে আন্তর্জাতিক দেনা মেটানো কঠিন হবে।
টাকার মান পতন: ডলারের বিপরীতে টাকার মান হু হু করে কমে যাবে, ফলে আমদানি করা প্রতিটি পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।
এলসি সংকট: কাঁচামাল আমদানির অভাবে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার ফলে ব্যাপক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হবে।
মূল্যস্ফীতি: খাদ্য ও জ্বালানি সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে।
ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট: প্রবাসীদের আমানত ও লেনদেন কমে গেলে ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা হারাবে, যা দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকে পঙ্গু করে দেবে।
পরিশেষে বলা যায়, রেমিট্যান্স শাটডাউন কোনো গঠনমূলক সমাধান হতে পারে না; বরং এটি আত্মঘাতী একটি পদক্ষেপ। দেশের অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রবাসীদের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি সরকারেরও উচিত প্রবাসীদের আস্থা অর্জনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। ডলারের বিনিময় হারের ব্যবধান কমানো, প্রবাসীদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা এবং সংকটে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে এই শাটডাউন বা অনাস্থার সংস্কৃতি দূর করা সম্ভব।











