প্রবাসীদের জন্য বিশেষ পেনশন স্কিম কি আদৌ লাভজনক?

বিদেশের মাটিতে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন, সেই প্রবাসীদের বার্ধক্যকাল নিরাপদ করতে সরকার চালু করেছে ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম- প্রবাস’। প্রবাসীদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার এই মহাপরিকল্পনা নিয়ে যেমন ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি এর কিছু প্রায়োগিক চ্যালেঞ্জ নিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
দশকের পর দশক ধরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ বিদেশের মাটিতে কাজ শেষে শূন্য হাতে দেশে ফেরেন। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো অবসরকালীন সুবিধা না থাকায় শেষ বয়সে অনেককেই স্বজনদের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। এই অনিশ্চয়তা দূর করতেই মূলত ‘প্রবাস’ স্কিমটির যাত্রা। যেখানে প্রবাসীরা নির্দিষ্ট হারে মাসিক কিস্তি দিয়ে ৬০ বছর বয়সের পর থেকে আজীবন মাসিক পেনশন সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
এই স্কিমের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি। একজন প্রবাসী বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে ক্রেডিট কার্ড বা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় এই কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো, কিস্তির টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় দিলেও পেনশন যখন শুরু হবে, তখন তা দেশের প্রচলিত মুদ্রায় পাওয়া যাবে। যদি কোনো প্রবাসী ১০ বছর বা তার বেশি সময় কিস্তি দেওয়ার পর দেশে স্থায়ীভাবে ফিরে আসেন, তবে তিনি এই স্কিমটি চালিয়ে নিতে পারবেন অথবা সাধারণ স্কিমে রূপান্তর করতে পারবেন।
আরও পড়ুনঃ সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সতর্কবার্তা, জেনে নিন প্রয়োজনে যোগাযোগের নম্বর!
তবে এই মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। অনেক প্রবাসী মুদ্রাস্ফীতি বা টাকার মান কমে যাওয়ার (Devaluation) বিষয়টিকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। তাদের আশঙ্কা, আজ যে পরিমাণ টাকা কিস্তি হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, ১৫ বা ২০ বছর পর পেনশনের টাকার ক্রয়ক্ষমতা বাজারমূল্যের সাথে সংগতিপূর্ণ থাকবে কি না। এছাড়া, বিদেশের অনেক শ্রমবাজারে কাজের অনিশ্চয়তা থাকায় নিয়মিত দীর্ঘমেয়াদী কিস্তি চালিয়ে যাওয়া অনেক শ্রমিকের জন্য কঠিন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই স্কিমটিকে আরও জনপ্রিয় করতে হলে সরকারকে এর সাথে কিছু তাৎক্ষণিক সুবিধা যোগ করতে হবে। যেমন পেনশন স্কিমের বিপরীতে জরুরি প্রয়োজনে ঋণ সুবিধা বা পরিবারের সদস্যদের জন্য স্বাস্থ্য বীমার অন্তর্ভুক্তি। এতে প্রবাসীরা কেবল ভবিষ্যতের আশায় নয়, বরং বর্তমানের নিরাপত্তার জন্যও এই স্কিমে যুক্ত হতে আগ্রহী হবেন।
একনজরে প্রবাস পেনশন স্কিমের মূল দিকসমূহ:
নিশ্চিত সামাজিক সুরক্ষা: ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পেনশনের নিশ্চয়তা। যদি পেনশনার ৭৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে মারা যান, তবে তার মনোনীত নমিনী অবশিষ্ট সময় পর্যন্ত পেনশন পাবেন।
বৈদেশিক মুদ্রায় কিস্তি: প্রবাসীরা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় কিস্তি দিতে পারেন, যা দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধিতেও সহায়ক।
নমনীয় কিস্তি হার: মাসিক ২ হাজার, ৫ হাজার বা ১০ হাজার টাকা—পছন্দমতো কিস্তি বেছে নেওয়ার সুযোগ। কিস্তিগুলো মাসিক, ত্রৈমাসিক বা বার্ষিক ভিত্তিতে দেওয়া সম্ভব।
কর রেয়াত: এই স্কিমে জমা দেওয়া কিস্তির টাকা বার্ষিক আয়কর রিটার্নে বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হবে এবং কর রেয়াত পাওয়া যাবে।
নিরাপত্তা: সরকারি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হওয়ায় এখানে অর্থ খোয়া যাওয়ার কোনো ভয় নেই, যা বেসরকারি অনেক বিনিয়োগ স্কিমের তুলনায় নিরাপদ।











