নভেম্বর ৯, ২০২৬
#এডিটর্স পিক

প্রবাসীর ঘাম, বাংলাদেশের সম্মান

রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি ও পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, দেশে গত অর্থবছরে ৩০ বিলিয়নেরও বেশি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে এবং হুন্ডি বন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে।
আমরা সবাই জানি, আমাদের দেশের অর্থনীতি যে কয়েকটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স অন্যতম। আজ আমরা বিস্তারিত জানবো কীভাবে এই অর্থ আমাদের দেশের চাকা সচল রাখছে।
রেমিট্যান্স কী ও এর উৎস:
সহজ কথায়, রেমিট্যান্স হলো প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ, যা তারা নিজ দেশে অবস্থানরত পরিবারের কাছে পাঠান। আমাদের লাখ লাখ ভাই-বোন মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কঠোর পরিশ্রম করছেন। শুধু তাদের পরিবারের ভরণপোষণ নয়, বরং তাদের পাঠানো এই বৈদেশিক মুদ্রাই আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে।
বিদায়ী মে মাসে দেশে মোট ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার (৩.৪২ বিলিয়ন ডলার) রেমিট্যান্স এসেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই অংক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫.৩৪ শতাংশ বেশি।
গত বছরের মে মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৯৬ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৪৫ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। টানা ৬ মাস ধরে ৩ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক: এর আগের মাসগুলোতেও প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ধারাবাহিকভাবে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। চলতি অর্থবছরের মোট আয়: ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) দেশে মোট ৩ হাজার ২৭৫ কোটি ৬৭ লাখ ৮০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এই রেমিট্যান্স প্রবাহ বেশ বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে এসেছে।

জাতীয় অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের প্রভাব:
রেমিট্যান্স কীভাবে আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, তা কয়েকটি পয়েন্টে বোঝা যায়:
১. বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ: দেশের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রার যে রিজার্ভ প্রয়োজন হয়, রেমিট্যান্স তার বড় জোগানদাতা।
২. দারিদ্র্য বিমোচন: প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য কমাতে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে সরাসরি সাহায্য করে।
৩. বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তা তৈরি: রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ মানুষ জমি কেনা, বাড়ি নির্মাণ বা নতুন ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করে।
সাম্প্রতিক তথ্য:
গত অর্থবছরে দেশ ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁয়ে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আয় করেছে। এমনকি চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকগুলোতেও এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে।
হুন্ডি প্রতিরোধ ও বৈধ পথের গুরুত্ব:
অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে আমাদের এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অনেকেই অবৈধ মাধ্যম বা ‘হুন্ডি’র মাধ্যমে টাকা পাঠান। এতে প্রবাসীরা সাময়িকভাবে লাভবান মনে হলেও, দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে সরকার আড়াই শতাংশ (২.৫%) প্রণোদনা দিচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশ দিয়েছে, ব্যাংকিং সময়ে রেমিট্যান্সের তথ্য আসার সাথে সাথেই একই দিনে তা গ্রাহকের হিসাবে জমা করতে হবে। এটি পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ করেছে।

রেমিট্যান্স গ্রহণের প্রধান মাধ্যমসমূহঃ

ব্যাংকিং চ্যানেল: সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের মাধ্যমে সরাসরি অ্যাকাউন্টে টাকা আসে।

মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS): বিকাশ (bKash), রকেট, নগদ বা ওকে ওয়ালেটের (OK Wallet) মাধ্যমে প্রবাসীরা তাৎক্ষণিকভাবে দেশে টাকা পাঠাতে পারেন।

মানি ট্রান্সফার সংস্থা: ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, মানিগ্রাম বা রিয়ার মতো অনুমোদিত এজেন্টের মাধ্যমে নগদ অর্থ উত্তোলন করা যায়।চ্যালেঞ্জ ও সমাধান:
রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কা আসে ইন্টারনেট বা যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে এবং বিদেশে দক্ষ শ্রমিকের তুলনায় অদক্ষ শ্রমিক বেশি যাওয়ার কারণে। এর সমাধানে আমাদের প্রবাসীদের আরও বেশি দক্ষ (স্কিলড) করে বিদেশে পাঠানো উচিত এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, রেমিট্যান্স কেবল টাকা পাঠানোর মাধ্যম নয়; এটি আমাদের প্রবাসীদের ভালোবাসা এবং দেশের প্রতি ত্যাগের প্রতীক। আমাদের অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো অব্যাহত রাখতে হবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *