কেবল স্কলারশিপ নয় ফুল ফান্ডেড পিএইচডি: ইউরোপ ও এশিয়ায় গবেষণার সুযোগে আকর্ষণীয় বেতন

ইউরোপ ও এশিয়ার উন্নত দেশগুলোতে ফুল ফান্ডেড পিএইচডি করার সুযোগকে কেবল সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা হিসেবে দেখা হয় না, বরং গবেষককে বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণকালীন কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই গবেষণাকালীন চুক্তির আওতায় প্রবাসীরা সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য বীমা ও পেনশনের সুযোগসহ বিপুল পরিমাণ মাসিক বেতন পান। ফলে আর্থিক অনিশ্চয়তা ছাড়াই আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগারে কাজের সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জনকে নিছক শিক্ষার্থী জীবন মনে করা হলেও ইউরোপ ও এশিয়ার বেশ কিছু প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ আলাদা। নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ডেনমার্ক, জার্মানি কিংবা ফিনল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষকদের শিক্ষার্থী না ডেকে ‘ডক্টরাল রিসার্চার’ বা গবেষণা কর্মকর্তা বলা হয়। তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কাজের চুক্তিপত্র বা এমপ্লয়মেন্ট কন্ট্রাক্ট প্রদান করা হয়।
এই মডেলে গবেষকদের একটি নির্দিষ্ট পদের বিপরীতে নিয়োগ দেওয়া হয়, যেখানে তাদের প্রতিদিনের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বজায় রেখে কাজ করতে হয়। ল্যাবরেটরি গবেষণা চালানোর পাশাপাশি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের টিউটোরিয়াল ক্লাস নেওয়া কিংবা অ্যাসাইনমেন্ট মূল্যায়নে তাদের ভূমিকা রাখতে হয়। এর বিনিময়ে মাস শেষে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিয়মিত পেশাদার বেতন যুক্ত হয়।
কোনো শিক্ষার্থী যখন একটি ফুল ফান্ডেড পিএইচডি পদের জন্য নির্বাচিত হন, তখন তার আয় বা জীবনযাত্রার মান আর দশজন পূর্ণকালীন চাকুরিজীবীর চেয়ে কোনো অংশে কম হয় না। উদাহরণ হিসেবে সুইজারল্যান্ডের কথা বলা যায়, যেখানে একজন ডক্টরাল গবেষকের প্রারম্ভিক বার্ষিক বেতন ৫০,০০০ থেকে ৭০,০০০ সুইস ফ্রাঙ্ক পর্যন্ত হয়ে থাকে। একইভাবে সুইডেন, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডে প্রারম্ভিক মাসিক বেতন ২,৮০০ থেকে ৪,০০০ ইউরোর কাছাকাছি থাকে।
প্রতিবছর কাজের দক্ষতা ও অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে এই বেতনের স্কেল বা ধাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। এই মোটা অঙ্কের বেতনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী তারা বৈষম্যহীন চিকিৎসা সুবিধা, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও অবসরের সময়ের পেনশন সুবিধা পেয়ে থাকেন। গবেষক যদি পরিবার বা সন্তান নিয়ে অবস্থান করেন, তবে তার জন্য বিশেষ পারিবারিক ভাতা ও শিশু যত্নের অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়।
ইউরোপীয় অঞ্চলের পাশাপাশি এশিয়ার উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতেও গবেষকদের সম্মানিত অবস্থানে রাখা হয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রজেক্ট ফান্ডের মাধ্যমে ডক্টরাল গবেষকদের পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা হয়। সিঙ্গাপুরের ‘সিংগা’ (SINGA) কিংবা এনইউএস-এর নিজস্ব ফান্ডের অধীনে থাকা গবেষকরা প্রতি মাসে অত্যন্ত উচ্চমানের স্টাইপেন্ড ও বেতন পেয়ে থাকেন।
একইভাবে জাপানের স্বনামধন্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বা প্রজেক্টগুলোতে সরাসরি প্রজেক্ট ফেলো হিসেবে গবেষকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। গবেষণার আনুষঙ্গিক সব খরচ, আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নেওয়ার বিমান ভাড়া এবং নতুন গবেষণার পেটেন্ট ফি সবই ল্যাব ও প্রজেক্টের বাজেট থেকে বহন করা হয়। ফলে নিজের মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার আর্থিক সীমাবদ্ধতা গবেষকের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
গবেষণার ৩ থেকে ৪ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা প্রবাসীদের বিশ্বমানের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান কিংবা একাডেমিয়ায় উচ্চ পদে আসীন হতে সাহায্য করে। যেসব দেশে এই সময়কে আনুষ্ঠানিকভাবে চাকরি হিসেবে গণ্য করা হয়, সেখানে উক্ত মেয়াদে দেশে অবস্থানের সময়কালকে রেসিডেন্সি বা নাগরিকত্ব অর্জনের সময় হিসেবে হিসাব করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, সুইডেন বা ফিনল্যান্ডে ডক্টরাল গবেষক হিসেবে ৪ বছর সফলভাবে কাজ সম্পন্ন করার পর সরাসরি স্থায়ী আবাসন বা পারমানেন্ট রেসিডেন্সির (PR) আবেদনের যোগ্যতা অর্জন করা যায়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো পড়ালেখা শেষে আলাদা করে কঠিন শর্তে চাকরি খোঁজার দুশ্চিন্তা এখানে থাকে না। জীবনের শুরুতেই একটি আন্তর্জাতিক ফুল ফান্ডেড পিএইচডি সম্পন্ন করা তাই কেবল একটি অর্জিত ডিগ্রি নয়, বরং নিশ্চিত উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রবেশদ্বার।











