প্রবাসে স্টার্টআপ ফান্ডিং: বাংলাদেশি তরুণদের আইটি সুযোগ ও মূলধন পাওয়ার উপায়

প্রবাসে স্টার্টআপ ফান্ডিং বর্তমানে বাংলাদেশি উদীয়মান তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও তরুণদের জন্য ইউরোপের বাণিজ্যিক বাজারে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পাওয়ার নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। প্রথাগত সিলিকন ভ্যালি বা লন্ডনের কঠিন প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে এখন লিথুয়ানিয়া ও আর্মেনিয়ার মতো প্রযুক্তিবান্ধব দেশগুলো বিদেশি তরুণদের আইটি উদ্ভাবনে সরাসরি অর্থায়ন ও ভিসা দিচ্ছে। সরকারি অনুদান, অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট এবং আন্তর্জাতিক ভেনচার ক্যাপিটালের সহজলভ্যতার কারণে বাংলাদেশি টেক স্টার্টআপগুলোর বৈশ্বিক বিস্তার এখন অনেকটাই হাতের নাগালে।
দক্ষিণপূর্ব ইউরোপের দেশ লিথুয়ানিয়া বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ফিনটেক ও তথ্যপ্রযুক্তি হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। অহেতুক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না থাকা এবং শতভাগ ডিজিটাল সরকারি সেবার কারণে দেশটি বিদেশি প্রতিষ্ঠাতা টানা সহজ করে দিয়েছে। প্রথাগত বিপুল মূলধন দেখানোর বাধ্যবাধকতা ছাড়াই সেখানে টেক আইডিয়ার মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে কাজ শুরু করা সম্ভব।
অন্যদিকে ককেশাস অঞ্চলের দেশ আর্মেনিয়াকে বলা হয় উদীয়মান ‘সিলিকন মাউন্টেন’। নতুন তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি স্টার্টআপগুলোর জন্য আর্মেনিয়া সরকার প্রায় শূন্য শতাংশ কর সুবিধা ও বিশেষ প্রণোদনা দিচ্ছে। বাংলাদেশি আইটি তরুণেরা যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, মোটর সাইকেল ট্র্যাকিং বা সফটওয়্যার সার্ভিসে কাজ করছেন, তারা খুব সহজেই ককেশাস ও ইউরোপীয় ইনভেস্টর নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হতে পারছেন।
ইইউ-বহির্ভূত দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ‘স্টার্টআপ লিথুয়ানিয়া’ একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এখানে বাংলাদেশ থেকে অনলাইনে আবেদন করে নিজের আইটি প্রোডাক্ট বা ধারণার পিচ ডেক জমা দেওয়া যায়। মূল্যায়ন কমিটি প্রজেক্টটির স্কেলেবিলিটি ও আন্তর্জাতিক সম্ভাবনা দেখলে সরাসরি এনডোর্সমেন্ট লেটার প্রদান করে, যার মাধ্যমে সহজেই আবাসিক পারমিট ও ভিসা মেলে।
দেশটিতে প্রবেশের পর উদ্যোক্তারা স্থানীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (VC) ফান্ডিং এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গবেষণামূলক ফান্ড পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। বাল্টিক অঞ্চলের ব্যাংক ও প্রাইভেট ইনভেস্টররা সাশ্রয়ী পরিচালন খরচে গ্লোবাল মার্কেট কাভার করা সফটওয়্যার উদ্যোগে প্রচুর মূলধন জোগাচ্ছে। এর সুবাদে বাংলাদেশি তরুণ উদ্ভাবকদের বিশ্ববাজারে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার পথ মসৃণ হচ্ছে।
বিদেশি তহবিল পাওয়ার জন্য বাংলাদেশি তরুণদের একটি কার্যকর মিনিমাম ভায়াবল প্রোডাক্ট (MVP) বা সুনির্দিষ্ট সলিউশন থাকা জরুরি। ফান্ডিং প্যানেলের সামনে নিজেদের প্রজেক্টের বাজার সম্ভাবনা তুলে ধরতে হবে অত্যন্ত পেশাদারভাবে। আইটি উদ্যোক্তাদের তৈরি সলিউশন যাতে গ্লোবাল চ্যালেঞ্জ সমাধান করতে পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা আবশ্যক।
আবেদনের সময়ে শক্তিশালী পোর্টফোলিও, ফাইন্যান্সিয়াল প্রোজেকশন এবং ৫ মিনিটের ভিডিও ডেমো জমা দিলে ফান্ড পাওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। স্থানীয় ইনকিউবেটর ও বিজনেস অ্যাক্সিলারেটরে যুক্ত হতে পারলে ভেনচার ক্যাপিটালিস্টদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ঘটানো সম্ভব হয়। প্রাথমিক বীজ মূলধন বা সীড মানি পাওয়ার পর পরবর্তী রাউন্ডে আরও বড় অংকের ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট পাওয়া সহজ হয়ে দাঁড়ায়।
আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভান সম্প্রতি আন্তর্জাতিক টেক কমিউনিটির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। সেখানকার সরকারি ও বেসরকারি ইনকিউবেটরগুলো নতুন আইটি প্রজেক্টের জন্য সীড ফান্ড থেকে শুরু করে ফ্রি অফিস স্পেস ও কারিগরি পরামর্শ দিয়ে থাকে। দেশটির সফটওয়্যার সেক্টরে দ্রুত বৃদ্ধির হার থাকার কারণে ইউরোপীয় মূলধনের একটা বড় অংশ আর্মেনিয়ার স্টার্টআপগুলোতে প্রবাহিত হচ্ছে।
বাংলাদেশি তরুণরা যারা ফ্রিল্যান্সিং বা ছোট সফটওয়্যার এজেন্সি থেকে বড় ভেঞ্চারে রূপান্তর করতে চান, তারা আর্মেনিয়াকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার উর্বর ভূমি হিসেবে নিতে পারেন। সেখানকার কম জীবনযাত্রার ব্যয় ও ট্যাক্স ছাড়ের সুবিধা নতুন কোম্পানির টিকে থাকার হার বাড়িয়ে দেয়। এতে সীমিত বাজেটেও দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক প্রোডাক্ট তৈরি অব্যাহত রাখা যায়।
আমদানিকৃত প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের তৈরি সফটওয়্যার ও সার্ভিস আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে প্রবাসে স্টার্টআপ ফান্ডিং একটি মাইলফলক। সঠিক কৌশল এবং বৈশ্বিক টেক হাবগুলোর নিয়মিত আপডেট রাখলে যেকোনো দূরদর্শী বাংলাদেশি তরুণ নিজের উদ্ভাবনকে ইউরোপের বাণিজ্যিক অঙ্গনে নিয়ে যেতে পারেন। ভিসা প্রক্রিয়া আগের চেয়ে সহজ হওয়ায় এখন মূল বাধা কেবল উদ্ভাবনী চিন্তা এবং সঠিক বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ।











