প্রবাসীদের ভাগ্যবদলে কি ভূমিকা রাখবে প্রবাসী কার্ড?

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ওয়ান-স্টপ সেবার আওতায় আনতে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হতে যাচ্ছে প্রবাসী কার্ড। বিদেশ গমন, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, ভিসা ছাড়পত্র, বিদেশে সুরক্ষা, দেশে পরিবারের সহায়তা কিংবা প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে নতুন করে আত্মকর্মসংস্থান—এই পুরো অভিবাসনযাত্রাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর নিচে নিয়ে আসতে সরকার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী মাস থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে এই ড্যুয়াল কারেন্সি ডেবিট প্রবাস কার্ডের পাইলেটিং বা পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।
আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান সর্বাগ্রে হলেও অভিবাসনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের প্রতিনিয়ত নানাবিধ প্রশাসনিক জটিলতা ও বিচ্ছিন্ন সেবাব্যবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রশিক্ষণ, ভিসা ছাড়পত্র কিংবা বিদেশে জরুরি সুরক্ষার ক্ষেত্রে সমন্বিত কাঠামোর অভাব দীর্ঘদিনের। একজন কর্মী বিদেশে গিয়ে কষ্টার্জিত আয় দেশে পাঠাতে এবং পরবর্তীতে সেই অর্থ সঠিকভাবে বিনয়োগ করতে গিয়ে বহু আমলাতান্ত্রিক বাধার মুখে পড়েন।
এই বাস্তবতায় প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতেই সরকারের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এটি কেবল একটি সাধারণ ডেবিট বা ক্রেডিট প্লাস্টিক কার্ড নয়, বরং এটি দেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করার এবং পুরো সেবাব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ। কার্ডটির সার্বিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদেশে কর্মরত প্রতিটি নাগরিকের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি হবে, যা তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সেবা প্রাপ্তি বহুগুণ সহজ করে দেবে।
এই বিশেষ ব্যাংকিং কার্ডের বড় আকর্ষণ হলো এর ডুয়েল কারেন্সি ও আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সুবিধা। প্রবাসীরা যে দেশে কর্মরত আছেন, সেই দেশের স্থানীয় মুদ্রায় উপার্জিত অর্থ এই কার্ডে জমা করতে পারবেন এবং দেশে থাকা তাঁদের পরিবার সরাসরি টাকায় তা উত্তোলন বা কেনাকাটা করতে পারবে। ফলে অবৈধ হুন্ডি ব্যবসার নেটওয়ার্ক ভেঙে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
পাশাপাশি, এই কার্ডধারী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিশেষ ক্রেডিট স্কোরিং, স্বল্প সুদে জামানতবিহীন ঋণ এবং ব্যাংকিং প্রণোদনার সুবিধা ভোগ করবেন। দেশে জমি রেজিস্ট্রি, খতিয়ান মিউটেশন ও বিভিন্ন ইউটিলিটি লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রেও কার্ডধারীদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এমনকি প্রবাসীরা যেকোনো বিপদে এই কার্ডের কিউআর কোড বা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে সরাসরি কনস্যুলার সহায়তা দাবি করতে পারবেন।
সরকারের চূড়ান্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক যৌথ সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে এই কার্ড ইস্যু করবে। পরীক্ষামূলক বা পাইলট প্রকল্প হিসেবে আগামী মাসেই একটি সুনির্দিষ্ট প্রোটোকল মেনে প্রবাসীদের হাতে কার্ড তুলে দেওয়া শুরু হবে। কর্মসূচির প্রথমাংশে ডিসেম্বরের মধ্যেই ৫০ হাজার কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে প্রবাসীদের নিকট।
পরবর্তী ধাপে এই সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত করে আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে অন্তত ২ লাখ নিবন্ধিত প্রবাসীকে প্রবাসী কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে জনতা ব্যাংকের পাশাপাশি বিশেষায়িত ‘প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক’ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এই সুবিধার সাথে পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত করা হবে। বিএমইটির ডাটাবেজে থাকা নিবন্ধিত কর্মীরা খুব সহজেই দূতাবাস বা অনলাইন পোর্টাল থেকে আবেদন ফরম পূরণ ও নথি জমা দিয়ে কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন।
দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে প্রবাসীরা প্রতিনিয়ত নানা হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। কার্ডধারী প্রবাসীরা দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ ভিআইপি ইমিগ্রেশন বুথ ও বিমানবন্দর লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। সেই সাথে উড়োজাহাজের টিকিট কাটা এবং দেশে-বিদেশে হোটেল বুকিংয়ের ওপর আকর্ষণীয় মূল্যছাড় সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
এছাড়া দুর্ঘটনাবশত প্রবাসে কোনো কর্মী প্রাণ হারালে তাঁর লাশ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেশে ফিরিয়ে আনা, পরিবারের জন্য বিমা সুবিধা এবং প্রত্যাবর্তনকারী প্রবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রবাসী কার্ড অন্যতম মূল দলিল হিসেবে কাজ করবে। রাষ্ট্র প্রবাসীদের এই অনবদ্য অবদানের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে পারলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভিত আরও শক্ত ও টেকসই হবে।











