আগস্টে শক্তিশালী রেমিট্যান্সে চাঙ্গা দেশের অর্থনীতি

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম মূল হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত প্রবাসী আয় প্রবাহ নতুন অর্থবছরের সূচনাতেই অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্বস্তিদায়ক অবস্থানে বজায় রয়েছে। চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে মোট ২৯৭ কোটি ৬৬ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি ২২ দশমিক ৫০ শতাংশেরও বেশি।
অফিশিয়াল বা বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠানোর যে ইতিবাচক প্রবণতা প্রবাসী কর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে, তার পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে ডলারের সুষম বিনিময় হার। হুন্ডি প্রতিরোধে ব্যাংকিং খাতের কড়া নজরদারি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানামুখী পদক্ষেপ প্রবাসীদের বৈধ ব্যবস্থার প্রতি ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করেছে। ব্যাংকিং সেবা আগের চেয়ে অনেক সহজ ও দ্রুতগতির করায় সাধারণ কর্মীরা এখন নির্বিঘ্নে নিজেদের উপার্জিত অর্থ পরিবারের কাছে পাঠাতে পারছেন।
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের ওপর ব্যাংকগুলোর দেওয়া অতিরিক্ত প্রণোদনা এবং সহজ ডিজিটাল রেমিট্যান্স সার্ভিসও বড় ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী শ্রমবাজারগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স আসার গতি আগের চেয়ে বেড়েছে। দেশের সার্বিক ব্যাংকিং খাতে তারল্য সরবরাহ বৃদ্ধি ও ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রবাসী আয়ের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
অর্থনীতির নানা অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মধ্যেও শক্তিশালী প্রবাসী আয় প্রবাহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষায় বড় রকমের স্বস্তি এনে দিয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে আমদানি দায় মেটাতে গিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছিল, টানা দুই মাস রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স আসায় তা অনেকটাই শিথিল হয়েছে। জুলাই মাসের ২৮৬ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের ধারাবাহিকতায় আগস্টে প্রবৃদ্ধি আরও বৃদ্ধি পাওয়া অত্যন্ত ইতিবাচক সংকেত।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রফতানি আয়ের গতি সাময়িকভাবে শ্লথ থাকলেও রেমিট্যান্সের এই জোয়ার দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি দ্রুত কমিয়ে আনবে। ব্যাংকগুলোতে ডলার ধারণক্ষমতা বাড়ায় আমদানিকারকরা প্রয়োজনীয় পণ্যের এলসি বা ঋণপত্র সহজে খুলতে পারছেন। সার্বিকভাবে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্তর নিয়ন্ত্রণে রাখা ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা এতে সহজতর হচ্ছে।
বৈধ পথকে আরও আকর্ষণীয় করতে দেশীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অ্যাপস ও এক্সচেঞ্জ হাউসের সঙ্গে সমঝোতা জোরদার করেছে। প্রবাসীরা এখন নিজেদের কর্মস্থল থেকেই সরাসরি স্বজনদের অ্যাকাউন্টে অথবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ পাঠাচ্ছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ায় অবৈধ আর্থিক লেনদেনের ঝুঁকি এড়িয়ে অফিশিয়াল চ্যানেলকেই মূল পছন্দ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন কর্মীরা।
তবে এই বাণিজ্যিক অর্জনকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে প্রবাসীদের কল্যাণমূলক সেবার আওতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিশেষ জীবন বীমা, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা এবং নিরাপদ বিনিয়োগ স্কিম নিশ্চিত করা গেলে প্রবাস থেকে দেশে মূলধন আসার গতি আরও বেগবান হবে। সঠিক নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে নতুন রেকর্ড গড়া সম্ভব।











