প্রবাসীদের পরিবারের কান্না;সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের পর মৃতদেহ ফেরত না দেয়া

সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে শাস্তি কার্যকরের পরও পরিবারের দুর্ভোগ শেষ হচ্ছে না। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর অনেক পরিবারের কাছে মরদেহ ফেরত দেওয়া হয় না, এমনকি কোথায় দাফন করা হয়েছে—সেটিও পরিবারকে জানানো হয় না।
বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের মতো শ্রম-অভিবাসননির্ভর দেশের জন্য। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার। সেখানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বিভিন্ন পেশায় কাজ করছেন।
মৃত্যুদণ্ডের পরও কেন এই অনিশ্চয়তা?
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করার অভিযোগ নতুন নয়। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানগুলো বলছে, বিদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটেছে, যেখানে পরিবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানলেও মরদেহ বা দাফনের স্থান সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পায়নি।
২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত *El País*-এর একটি অনুসন্ধানে ইথিওপীয় অভিবাসীদের কয়েকটি পরিবারের কথা উঠে এসেছে। সেখানে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাদের স্বজনদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর তারা মরদেহ ফেরত পাননি এবং কোথায় দাফন করা হয়েছে তাও জানতে পারেননি। প্রতিবেদনটি বলছে, মানবাধিকার সংস্থা Amnesty International ও Reprieve দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের চর্চা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।
মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা বাড়ছে
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা Reprieve-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে অন্তত ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আধুনিক সময়ে সর্বোচ্চ বার্ষিক সংখ্যা।
এর মধ্যে বিদেশি নাগরিকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। Amnesty International-এর ২০২৬ সালের জুনের হিসাব অনুযায়ী, ওই বছরের প্রথমার্ধেই সৌদি আরবে প্রায় ১০০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে অন্তত ৬১ জন মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডিত ছিলেন।
মাদক-সংক্রান্ত মামলায় মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত। ২০২২ সালের শেষ দিকে সৌদি আরব মাদক-অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর আবার শুরু করে এবং এরপর বিদেশি নাগরিকদের ওপর এর প্রভাব নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
বাংলাদেশিদের জন্য বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ সৌদি আরবে কোনো বাংলাদেশি গুরুতর অপরাধে আটক হলে তার পরিবার অনেক সময় দেশের ভেতর থেকেই আইনি প্রক্রিয়া, আইনজীবী, ক্ষমা প্রার্থনা এবং দূতাবাসের সহায়তার ওপর নির্ভর করে।
অতীতে সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাও ঘটেছে। ২০১১ সালে একসঙ্গে আট বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা Amnesty International নথিভুক্ত করেছিল।
এ ধরনের ঘটনায় পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখটি কি তারা দেখতে পারবেন?
পরিবারের কষ্ট এখানেই শেষ নয়
একজন প্রবাসী যখন বিদেশে মৃত্যুবরণ করেন, তখন সাধারণ মৃত্যুর ক্ষেত্রেও মরদেহ দেশে ফেরাতে নানা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, হাসপাতাল, পুলিশ, দূতাবাস, বিমান পরিবহন ও কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশ সরকার প্রবাসে মৃত কর্মীদের মরদেহ দেশে আনার ক্ষেত্রে সহায়তা দিয়ে থাকে এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে মৃত কর্মীর পরিবারকে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে।
কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার সংকট তৈরি করে।
কারণ তখন পরিবার শুধু আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে না; তারা হারায় শেষ বিদায়ের সুযোগ, জানাজার সুযোগ এবং প্রিয়জনকে নিজ মাটিতে দাফন করার সুযোগ।
আইনি সহায়তা নিয়েও প্রশ্ন
মানবাধিকার সংস্থাগুলো সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশিদের ক্ষেত্রে আইনজীবী পাওয়ার সুযোগ, অনুবাদ সুবিধা, স্বীকারোক্তির প্রক্রিয়া এবং বিচারিক স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলছে। Reuters-এর একটি প্রতিবেদনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশিদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এমন অভিযোগের কথা তুলে ধরা হয়েছিল যে কিছু ক্ষেত্রে আসামিরা পর্যাপ্ত আইনগত প্রতিনিধিত্ব পাননি এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিবারগুলোর কাছে তথ্য পাওয়া কঠিন ছিল।
২০২৬ সালে ইথিওপীয় কয়েকজন অভিবাসীর মৃত্যুদণ্ড নিয়েও Human Rights Watch অভিযোগ করেছে যে কিছু বিচার ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং অভিযুক্তদের পর্যাপ্ত আইনগত সহায়তা বা দোভাষী সুবিধা ছিল না।
এগুলো **সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য—এমন দাবি করা যাবে না**। তবে বিদেশি শ্রমিকদের মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও আইনি সুরক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ যে রয়েছে, তা স্পষ্ট।
—
বাংলাদেশের করণীয় কী?
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি সামনে আসতে পারে—
১. মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশিদের তালিকা তৈরি
সৌদি আরবে বর্তমানে কতজন বাংলাদেশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বা মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে আছেন—তার একটি হালনাগাদ তালিকা থাকা প্রয়োজন।
২. শুরু থেকেই আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা
আটকের পর নয়, মৃত্যুদণ্ডযোগ্য মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার শুরু থেকেই বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনজীবী ও দোভাষীর সুযোগ নিশ্চিত করতে দূতাবাসকে সক্রিয় হতে হবে।
৩. পরিবারকে নিয়মিত তথ্য দেওয়া
মামলার প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে বাংলাদেশে থাকা পরিবারকে দূতাবাসের মাধ্যমে নিয়মিত জানানো প্রয়োজন।
৪. ক্ষমা বা দণ্ড লাঘরের উদ্যোগ
মৃত্যুদণ্ডের রায় হওয়ার পর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কূটনৈতিকভাবে ক্ষমা বা দণ্ড লাঘরের আবেদন চালিয়ে যেতে হবে।
৫. মরদেহ ফেরত আনার বিষয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী মরদেহ বাংলাদেশে ফেরত আনা অথবা অন্তত দাফনের স্থান ও সময় সম্পর্কে পরিবারকে নিশ্চিত তথ্য দেওয়ার বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা প্রয়োজন।
৬. স্বচ্ছ পরিসংখ্যান প্রকাশ
সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিকদের আটক, মৃত্যুদণ্ড, দণ্ড লাঘর এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে নিয়মিত সরকারি তথ্য প্রকাশ করা দরকার।
—
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
একজন মানুষ বিদেশে গিয়ে অপরাধ করলে তার বিচার হতে পারে। আদালত আইন অনুযায়ী শাস্তিও দিতে পারে। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর **তার পরিবার কি অন্তত মরদেহটি ফিরে পাওয়ার অধিকার রাখে না?
একজন মা তার সন্তানের কবর দেখতে চান।
একজন স্ত্রী চান স্বামীর শেষ বিদায়টি নিজের চোখে দেখতে।
একজন সন্তান চান বাবার জানাজায় অংশ নিতে।
প্রবাসী কর্মীরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন; ২০২৪ সালে বিদেশ থেকে ৪,৮১৩ জন বাংলাদেশি অভিবাসীর মরদেহ দেশে ফেরত এসেছিল, যা প্রবাসী মৃত্যুর ব্যাপকতাও দেখায়।
তাই মৃত্যুর পরও যদি কোনো প্রবাসীর পরিবার জানতে না পারে—“আমার স্বজন কোথায় শুয়ে আছেন?”—তাহলে এটি শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়; এটি প্রবাসী নাগরিকের অধিকার, কূটনৈতিক সুরক্ষা এবং মানবিক মর্যাদার একটি বড় প্রশ্ন।
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি তাই শুধু ‘শাস্তি কার্যকর’ হওয়ার খবর নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আইনি সহায়তা, পরিবারের জানার অধিকার এবং মৃত্যুর পর শেষ বিদায়ের অধিকার।










