ইউরোপে বাংলাদেশি খাদ্য আমদানিকারক প্রবাসী ব্যবসায়ীদের নতুন চ্যালেঞ্জ

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর সিবিএএম নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে ইউরোপে বাংলাদেশি গ্রোসারি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য আমদানিতে যুক্ত হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ। ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশে পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা ও কার্বন ট্র্যাকিং বাধ্যতামূলক করায় একাতিক প্রবাসী এগ্রো-ইম্পোর্টার পড়েছেন নতুন সমীকরণের মুখে।
তবে এই পরিবর্তন যেমন একদিকে ছোট ও মাঝারি প্রবাসী উদ্যোক্তাদের লাভের ওপর চাপ তৈরি করছে, ঠিক তেমনই নিয়ম মেনে চলা ব্যবসায়ীদের জন্য প্রিমিয়াম ও এলিট মার্কেটে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের এক বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘কার্বন বর্ডার এডজাস্টমেন্ট মেকানিজম’ বা সিবিএএম মূলত বিশ্বব্যাপী কার্বন নিগমন কমানো এবং টেকসই বাণিজ্যে উদ্বুদ্ধ করার এক নতুন বৈশ্বিক উদ্যোগ। এর প্রভাব এখন সরাসরি এসে পড়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি গ্রোসারি দোকান, ক্যাটারিং বিজনেস ও ইম্পোর্ট ডিস্ট্রিবিউশন হাবগুলোর ওপর। যেসব প্রবাসী আমদানিকারক বাংলাদেশ থেকে শুঁটকি, চাল, মসলা, স্ন্যাকস বা প্রক্রিয়াজাত শাকসবজি আনছেন, তাঁদের এখন থেকে সরবরাহ চেইনের কার্বন ইনটেনসিটি হিসাব রাখতে হচ্ছে।
এই কাঠামোর কারণে প্রথাগত উপায়ে পণ্য এনে বাজারজাত করার দিন শেষ হয়ে আসছে। ইউরোপের মূলধারার সুপারশপগুলোতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে হলে প্রবাসী ব্যবসায়ীদের এখন থেকেই আন্তর্জাতিক এই পরিবেশগত নিয়মকানুনের সঙ্গে দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে।
আইন মেনে চলতে ব্যর্থ হলে ইউরোপের কাস্টমস ও ট্যাক্সেশন বিভাগ থেকে অতিরিক্ত শুল্ক ও ইকোলজিক্যাল জরিমানা আরোপ করা হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন সীমিত মূলধনের ছোট ও মাঝারি বাংলাদেশি খাদ্য আমদানিকারক। পূর্বে যেখানে অনায়াসে কম খরচে কন্টেইনার খালাস করা যেত, সেখানে এখন সঠিক কার্বন সার্টিফিকেট না দেখালে আকাশচুম্বী অতিরিক্ত ট্যাক্স দিতে হচ্ছে।
ফলে বাজারে পণ্যের খুচরা বিক্রয়মূল্য বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা ইউরোপের প্রবাসীদের দৈনন্দিন বাজার খরচে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সাথে আমদানিকারকদের মুনাফার একটি বড় অংশ বের হয়ে যাচ্ছে অতিরিক্ত কাগজপত্র প্রস্তুত করা এবং ইকোলজিক্যাল ট্যাক্স মেটাতে গিয়ে।
সব বাধা অতিক্রম করে যারা পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ও স্বচ্ছ সাপ্লাই চেইন নিশ্চিত করতে পারবেন, তাঁদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। সিবিএএম নীতিমালা সঠিকভাবে অনুসরণ করলে বাংলাদেশি ফুড আইটেমগুলো কেবল বাঙালি বা দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির গ্রোসারি স্টোরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ইউরোপের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং শপগুলোতেও প্রিমিয়াম দামে বিক্রি করার দরজা খুলে যাবে।
ইউরোপের স্থানীয় ক্রেতারা এখন অর্গানিক এবং কার্বন-নিউট্রাল পণ্যের প্রতি বেশি ঝুঁকছেন। বাংলাদেশি মূলধারার রপ্তানিকারক ও প্রবাসী আমদানিকারকেরা যদি যৌথভাবে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করেন, তবে বৈশ্বিক এই ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে বাংলাদেশ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে।
চলমান এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ইউরোপ প্রবাসী বাংলাদেশি কমার্শিয়াল এসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) যৌথ উদ্যোগ আবশ্যক হয়ে পড়েছে। প্রবাসী আমদানিকারকদের প্রতি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যেন তারা দেশের প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক মানের কার্বন ট্র্যাকিং রিপোর্ট ও ইকো-সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করেই পণ্য শিপমেন্ট শুরু করেন।
পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে অনেক সম্ভাবনাময় এগ্রো-ব্যবসা ইউরোপের বাজার থেকে ছিটকে পড়তে পারে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ইউরোপের এই নতুন বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করা পুরোপুরি সম্ভব।











