ইতালিতে বাংলাদেশি নারী উদ্যোক্তাদের জয়জয়কার

ইউরোপীয় ফ্যাশনের প্রাণকেন্দ্র মিলান ও ঐতিহাসিক রোমের অভিজাত এলাকায় নিজস্ব মেধা আর পরিশ্রমে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন ইতালিতে বাংলাদেশি নারী উদ্যোক্তারা। ঐতিহ্যবাহী জামদানি, রাজকীয় মসলিন ও খাঁটি খাদি কাপড়ের নিজস্ব ডিজাইন আমদানির পাশাপাশি তারা প্রতিষ্ঠা করেছেন আধুনিক রূপচর্চাকেন্দ্র ও স্পা সেলুন। সম্পূর্ণ স্থানীয় কড়া প্রশাসনিক লাইসেন্স ও করব্যবস্থা মেনে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠান এখন শুধু প্রবাসী সমাজে নয়, মন জয় করে নিচ্ছে মূলধারার ইতালীয় ক্রেতাদেরও।
মিলানের ফ্যাশনপাড়া বরাবরই বৈশ্বিক ট্রেন্ড তৈরির কেন্দ্রভূমি। সেখানে এবার আভিজাত্যের নতুন মাত্রা যোগ করেছে বাংলাদেশের শতবর্ষ প্রাচীন মসলিন ও জামদানি। প্রবাসী নারী উদ্যোক্তারা দেশ থেকে সরাসরি তাঁতিদের দিয়ে তৈরি সুক্ষ্ম নকশার শাড়ি ও পোশাক আমদানি করছেন। পশ্চিমা কাটিং ও আধুনিক বুননের সঙ্গে দেশীয় ঐতিহ্যের মিশেলে তৈরি এই পোশাকগুলো ইতালীয়দের কাছে এক্সক্লুসিভ কালেকশন হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে।
বুটিকগুলোতে শুধু শাড়ি কিংবা সালোয়ার-কামিজেই সীমাবদ্ধ থাকা হয়নি। তরুণ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হচ্ছে খাদি কাপড়ের ব্লেজার, জ্যাকেট, সুতি কুর্তি ও স্কার্ফ। এখানকার স্থানীয় ইতালীয়রা এখন যেকোনো পার্টি কিংবা বিশেষ আয়োজনে আলাদা আবেদন ফুটিয়ে তুলতে বাংলাদেশি ডিজাইনারদের দ্বারস্থ হচ্ছেন। ফলে দেশীয় বয়নশিল্পের এক বিশাল আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি হচ্ছে ভূমধ্যসাগরের তীরে।
ইউরোপের যেকোনো দেশে বিউটি পার্লার বা স্পা সেন্টার খোলা বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। বিশেষ করে ইতালিতে স্বাস্থ্য দপ্তরের ছাড়পত্র, পেশাদার রূপচর্চার ডিপ্লোমা সনদ এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা অসম্ভব। সেই চ্যালেঞ্জটিকেই শক্তিতে রূপান্তর করেছেন বাংলাদেশি নারীরা।
তারা স্থানীয় প্রতিষ্ঠান থেকে পেশাদার বিউটি থেরাপি ও স্কিনকেয়ারের ওপর ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেছেন। এর পর স্থানীয় কর দপ্তর থেকে বিজনেস ট্যাক্স নম্বর (Partita IVA) নিয়ে সম্পূর্ণ বৈধ পথে নিজেদের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। পেশাদারিত্বের এই মান বজায় রাখায় মিলান ও রোমের মূলধারার কসমেটিকস ও রূপচর্চা খাতের সংশ্লিষ্টরাও তাদের সাদরে গ্রহণ করছেন। আধুনিক হেয়ার স্পা, অ্যারোমাথেরাপি ও ঐতিহ্যবাহী ভেষজ রূপচর্চার মেলবন্ধন ঘটিয়ে এই সেলুনগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
এক সময় প্রবাসে নারী বলতে কেবল গৃহিণী কিংবা নির্দিষ্ট কিছু স্বল্প আয়ের কাজের ছকেই তাদের দেখা যেত। সেই অচলায়তন পুরোপুরি ভেঙে দিয়ে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করছেন ইতালিতে বাংলাদেশি নারী উদ্যোক্তারা। তারা কেবল নিজেদের পরিবারকেই সচ্ছল করছেন না, বরং ইউরোপের মাটিতে তৈরি করছেন নতুন নতুন উদ্যোক্তা ও দক্ষ কর্মী।
অনেক পার্লারে এখন নিয়মিত নিয়োগ পাচ্ছেন নবাগত বাংলাদেশি তরুণীরা, যাদের আগে থেকেই কাজের অভিজ্ঞতা নেই। উদ্যোক্তারা নিজ উদ্যোগে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ইউরোপীয় মানের রূপচর্চা শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলছেন। এতে করে অভিবাসী নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন যেমন দ্রুত হচ্ছে, তেমনই প্রবাসে একাত্মতা ও আত্মমর্যাদার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
এই বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক বিস্তারের সরাসরি সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশও। পোশাক ও রূপচর্চার বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী দেশ থেকে নিয়মিত বাণিজ্যিক এলসির মাধ্যমে রপ্তানি হচ্ছে। ফলে দেশের প্রান্তিক তাঁতি ও কারিগররা বছরজুড়ে পাচ্ছেন কাজের নিশ্চয়তা।
বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলে ইতালিতে বাংলাদেশি নারী উদ্যোক্তা মহলের এই সাফল্য বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। প্রবাসীদের রক্তঘামে উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ নিয়মতান্ত্রিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স হিসেবে দেশে আসছে। ফলে জাতীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের হস্তশিল্পের নতুন ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি হচ্ছে।











