জাপান, রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপে কোন দক্ষতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি?

মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত শ্রমবাজারের বাইরে জাপান, রাশিয়া এবং রোমানিয়া বা পোল্যান্ডের মতো পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশি দক্ষ কর্মীদের নিয়োগের এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। মূলত প্রবীণ জনগোষ্ঠী বৃদ্ধি এবং নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও কেয়ারগিভিং খাতে তীব্র কর্মী সংকটের কারণে এসব দেশে বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের উচ্চ বেতনে নেওয়ার অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
জাপানে জনসংখ্যা হ্রাস ও দ্রুত প্রবীণ বৃদ্ধির ফলে দেশটিতে তীব্র শ্রমসংকট তৈরি হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় জাপান সরকার ‘নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী’ বা এসএসডব্লিউ (SSW) ক্যাটাগরির আওতায় ১৬টি খাতে ৮ লাখের বেশি বিদেশি কর্মী নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিশেষ করে প্রবীণদের দেখভালের জন্য কেয়ারগিভার, নার্সিং, ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল মেরামত ও নির্মাণ খাতে দক্ষ কর্মীদের বিপুল চাহিদা রয়েছে।
জাপানি ভাষায় এন-ফোর (N4) লেভেলের দক্ষতা এবং প্রাসঙ্গিক কাজের কারিগরি সনদ থাকলে বাংলাদেশি তরুণদের জন্য সেখানে স্থায়ীভাবে ক্যারিয়ার গড়ার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারও বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (TTC) জাপানি ভাষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বেতন ও চমৎকার জীবনযাত্রার মানের কারণে তরুণ প্রজন্ম এখন জাপানের দিকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট হচ্ছে।
পূর্ব ইউরোপের অর্থনীতিতে রোমানিয়া, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও বুলগেরিয়ার মতো দেশগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে অভাবনীয় ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি ঘটছে। এসব দেশের স্থানীয় অনেক দক্ষ কর্মী পশ্চিম ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে চলে যাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে বড় ধরনের শ্রম ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়ন, ওয়েল্ডিং, পাইপ ফিটিং, ইলেকট্রিক্যাল কাজ, কার্গো ড্রাইভিং ও লজিস্টিকস খাতে বিপুল পরিমাণ বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হচ্ছে।
ইউরোপের কারখানা ও অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে কাজের সুযোগ পেতে হলে নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর কাজ শেখার সনদ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক। প্রথাগত বাজার থেকে সরে এসে নতুন নতুন দেশে কাজের সুযোগ বাড়ায় বিদেশে দক্ষতার চাহিদা পূরণে সরকারি ও বেসরকারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে আধুনিক করা হচ্ছে। ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী কাজের প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক ইংরেজি ভাষা জানা থাকলে এই বাজারগুলোতে খুব সহজেই বাংলাদেশি কর্মীরা জায়গা করে নিতে পারেন।
রাশিয়ার বাণিজ্যিক বাজারে সম্প্রতি পোশাক শিল্প, কৃষি ও ভারী শিল্পে উৎপাদন ব্যবস্থা গতিশীল রাখতে বিপুলসংখ্যক টেকনিশিয়ান ও অপারেটর প্রয়োজন হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক বা অ্যাপারেলস সেক্টরে অভিজ্ঞ সোয়িং মেশিন অপারেটর এবং কারখানার মেকানিকদের সরাসরি নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। রাশিয়ান সরকার ও সে দেশের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে দক্ষ জনবল আমদানিতে বাড়তি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
রাশিয়ায় চাকরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো শিল্প কারখানাগুলোতে কাজের দক্ষতার মূল্যায়ন খুব দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে করা হয়। সেখানে টেক্সটাইল কারখানার পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং আধুনিক নির্মাণ খাতেও ভালো বেতনের চুক্তিভিত্তিক কাজের সুযোগ রয়েছে। সঠিক চ্যানেল ও সরকারি নিয়ম মেনে যেতে পারলে রাশিয়ার বাজারেও বাংলাদেশি পেশাজীবীদের জন্য বড় একটি আয়ের ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সুনির্দিষ্ট দক্ষতা ও ভাষা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীরা কেবল প্রথাগত কম বেতনের চাকরি থেকেই বেরিয়ে আসছেন না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের নিম্ন মজুরির কাজের চেয়ে তিন থেকে চারগুণ বেশি বেতনের এসব সুযোগ গ্রহণের জন্য বিদেশে দক্ষতার চাহিদা অনুযায়ী যুবসমাজকে তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।











