নভেম্বর ৯, ২০২৬
#জাতীয় #দুর্ঘটনা #মধ্যপ্রাচ্য

তিন দেশ থেকে ফিরল ৩৪ প্রবাসীর মরদেহ, বিমানবন্দরে স্বজনদের আহাজারি

কুয়েত, মালয়েশিয়া ও লিবিয়া থেকে বিশেষ ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন ৩৪ জন প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা। তবে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া এই মানুষগুলো ফিরেছেন নিথর দেহে, কফিনবন্দি হয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় দীর্ঘদিন আটকে থাকার পর অবশেষে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ উদ্যোগে এই মরদেহগুলো আজ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আজ এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। যে হাতগুলো মাসখানেক আগেও পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিল, সেই হাতগুলো আজ চিরতরে স্তব্ধ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয়জনের মুখটি দেখার জন্য বিমানবন্দরে ভিড় করেছিলেন বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী আর অবুঝ সন্তানেরা। কফিন শনাক্ত করার পর তাদের গগণবিদারী আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে বিমানবন্দরের আকাশ-বাতাস।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই ৩৪ জনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী লিবিয়া ও কুয়েতে কর্মরত ছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থা এবং লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে মরদেহগুলো সেখানে আটকে ছিল। বিশেষ করে লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও ফ্লাইট জটিলতার কারণে অনেক প্রবাসীর পরিবার গত কয়েক মাস ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন।

মন্ত্রণালয়ের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানান, “মরদেহগুলো ফিরিয়ে আনতে আমাদের কূটনৈতিক মিশনগুলো নিরলস কাজ করেছে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং বিশেষ কার্গো স্পেস নিশ্চিত করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, প্রাথমিক মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ী এদের সবার মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক। মূলত হৃদরোগ এবং বার্ধক্যজনিত কারণেই তারা বিদেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।”

আরও পড়ুনঃ সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সতর্কবার্তা, জেনে নিন প্রয়োজনে যোগাযোগের নম্বর!

প্রতিটি মরদেহের সাথে আসা নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এদের অধিকাংশই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। মালয়েশিয়া থেকে ফেরা টাঙ্গাইলের করিম মিয়ার (ছদ্মনাম) ভাই জানান, “ভাই বলেছিল সামনের ঈদে বাড়ি আসবে, আসলো ঠিকই—কিন্তু খাটিয়ায় চড়ে। এখন এই এতিম বাচ্চাদের দায়িত্ব কে নেবে?” এই প্রশ্নটি কেবল একজন ভাইয়ের নয়, বরং বিমানবন্দরের প্রতিটি কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারের।

বাংলাদেশি প্রবাসীরা বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাদের অকাল মৃত্যুতে পরিবারগুলো অথৈ সাগরে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মরদেহ ফিরিয়ে আনাই যথেষ্ট নয়; বরং এই পরিবারগুলোর টেকসই পুনর্বাসনের জন্য সরকারের বীমা সুবিধা ও প্রবাসী কল্যাণ তহবিলের কার্যকারিতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

মরদেহগুলো বিমানবন্দর থেকে অ্যাম্বুলেন্স যোগে তাদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় আশ্বাস দিয়েছে যে, মৃত প্রবাসীর পরিবারগুলো যেন দ্রুততম সময়ে সরকারি অনুদান ও বকেয়া পাওনা বুঝে পায়, সে বিষয়ে তারা সর্বোচ্চ তদারকি করবে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *