নভেম্বর ৯, ২০২৬
#নতুন প্রবাসী গাইড

দক্ষিণ কোরিয়া ইপিএস লটারি ও স্কিল ভিসার প্রস্তুতি যেভাবে নেবেন

সরকারি প্রক্রিয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া ইপিএস লটারি এবং স্কিল ভিসার মাধ্যমে স্বল্প খরচে উচ্চ বেতনের চাকরি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রার্থীর জন্য। রাষ্ট্রীয় সংস্থা বোয়েসেলের (BOESL) মাধ্যমে পরিচালিত এই নিরাপদ অভিবাসন প্রক্রিয়ায় কোনো দালালের হস্তক্ষেপ ছাড়াই যোগ্য তরুণরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের পথ খুঁজে পাচ্ছেন। সঠিক নিয়ম জেনে আগেভাগেই ভাষা ও দক্ষতার প্রস্তুতি নেওয়া হলে কোরিয়ার আধুনিক শিল্পখাতে নিশ্চিত করা সম্ভব নিজেদের স্বপ্নের ক্যারিয়ার।

মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত শ্রমবাজারের বাইরে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ও আকর্ষণীয় গন্তব্য হলো দক্ষিণ কোরিয়া। সেখানে ন্যূনতম মজুরি আইনে প্রবাসী কর্মীদের বেতন সুরক্ষিত থাকায় প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকারও বেশি আয়ের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়। তবে এই অভিবাসনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা।

বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল সরাসরি কোরিয়ার হিউম্যান রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসের (HRD Korea) সাথে সমন্বয় করে মাত্র কয়েক হাজার টাকা সরকারি খরচে কর্মীদের কোরিয়া পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

কোনো বেসরকারি এজেন্সী বা ব্যক্তিগত মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে কোরিয়ার সরকারি এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেমে (EPS) আবেদন করার কোনো আইনি সুযোগ নেই।

প্রার্থীরা সরাসরি অনলাইনে বোয়েসেলের নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে (eps.boesl.gov.bd) গিয়ে প্রাথমিক নিবন্ধন সম্পন্ন করেন। ন্যূনতম এসএসসি পাস এবং যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে, কেবল তারাই এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা লাভ করেন।

প্রতি বছর নির্ধারিত শূন্য পদের বিপরীতে কয়েক লাখ প্রার্থী আবেদন করায় প্রথম ধাপেই দক্ষিণ কোরিয়া ইপিএস লটারি আয়োজিত হয়। লটারিতে নাম আসা প্রার্থীরা মূলত পরবর্তী ধাপে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইপিএস-টপিক (EPS-TOPIK) কোরীয় ভাষা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান। বহু প্রার্থী লটারিতে নাম উঠলেও কেবল উপযুক্ত ভাষা দক্ষতার অভাবে কাঙ্ক্ষিত নম্বর পেতে ব্যর্থ হন। তাই বিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, লটারির ফলাফলের জন্য অপেক্ষা না করে আগে থেকেই সরকারি টিটিসি (TTC) বা স্বীকৃত ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কোরিয়ান রিডিং ও লিসেনিংয়ে দক্ষতা বাড়ানো উচিত।

কোরীয় ভাষা পরীক্ষায় কম্পিউটারভিত্তিক ইউবিটি (UBT) পদ্ধতিতে রিডিং ও লিসেনিং টেস্ট নেওয়া হয়। এই পরীক্ষায় কাট-অফ মার্কস পার করার পরই প্রার্থীর শারীরিক সক্ষমতা, কালার ভিশন পরীক্ষা এবং কারিগরি জ্ঞান যাচাইয়ে ‘স্কিল টেস্ট’ নেওয়া হয়। উভয় পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ প্রার্থীরাই কেবল চূড়ান্ত জব রোস্টারে অন্তর্ভুক্ত হন, যা কোরিয়ার নিয়োগকর্তাদের কাছে পৌঁছায়।

পূর্বে কেবল উৎপাদন শিল্প (Manufacturing), কৃষি বা মৎস্য খাতে সাধারণ ই-নাইন (E-9) ভিসায় কর্মীরা কোরিয়া যেতেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কোরীয় সরকার দক্ষ জনবলের ঘাটতি মেটাতে স্কিলড ওয়ার্কারদের জন্য ভিসা নীতি ব্যাপক শিথিল করেছে। একজন কর্মী E-9 ভিসায় গিয়ে টানা নির্দিষ্ট বছর সন্তোষজনকভাবে কাজ করলে তাকে বিশেষ স্কিল পয়েন্টের ভিত্তিতে ই-সেভেন-ফোর (E-7-4) ভিসায় রূপান্তরের সুবিধা দেওয়া হয়।

স্কিল ভিসায় উন্নীত হলে প্রার্থীরা স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের পরিবারকেও কোরিয়ায় নিয়ে আসার আইনি অনুমোদন পান। এ ছাড়া ওয়েল্ডিং, মেশিনারিজ ও মেকানিক্সের মতো টেকনিক্যাল কাজে দক্ষতা থাকলে সাধারণ কর্মীদের চেয়ে তাদের বেতন ও বোনাস অনেক বেশি নিশ্চিত হয়। তাই লটারি জয়ের পাশাপাশি নিজ নিজ কারিগরি কাজে দক্ষতা বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত সাফল্যের চাবিকাঠি।

কোরিয়ার ইপিএস প্রক্রিয়া চালু হলেই সামাজিক মাধ্যমে একশ্রেণীর প্রতারক চক্র সরাসরি ভিসা পাইয়ে দেওয়ার ভুয়া আশ্বাস দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করে। প্রার্থীদের স্পষ্ট মনে রাখা দরকার, লটারি প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে কোরিয়ান মালিকের জব অফার লেটার ইস্যু হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এতে কোনো কর্মকর্তা বা দালালের কারো নাম তালিকায় যুক্ত করার সুযোগ নেই।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *