সৌদিতে ছাদ থেকে পড়ে আজগরের মৃত্যু; ‘অবৈধ’ তকমায় আটকে আছে শেষ যাত্রা

সাড়ে তিন বছর আগে বুকভরা আশা আর ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে মরুভূমির দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন আজগর ব্যাপারী (৩৮)। লক্ষ্য ছিল পরিবারের অভাব দূর করা। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে আজ তিনি নিথর দেহ। গত সপ্তাহে সৌদি আরবে কর্মক্ষেত্রে ছাদ থেকে পড়ে তার মৃত্যু হলেও, আকামা বা বৈধ কাগজপত্র না থাকায় জন্মভূমিতে লাশ ফেরা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ঢাকার দোহার উপজেলার রাধানগর গ্রাম। যে জনপদে একসময় আজগরের ফেরার প্রতীক্ষায় দিন গুনত তার স্বজনরা, সেখানে এখন কেবল কান্নার রোল। সাড়ে তিন বছর আগে দালালের প্রলোভনে পড়ে ভিটেমাটি আর ধারদেনা করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন আজগর। প্রথম কয়েক বছর কোনোমতে কাটলেও শেষ এক বছর ছিল চরম সংগ্রামের। ভিসা জটিলতায় তিনি হয়ে পড়েছিলেন ‘অবৈধ’। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে লোহা ঝালাইয়ের (ওয়েল্ডিং) মিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। গত সপ্তাহে এক নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করার সময় ছাদ থেকে ছিটকে পড়েন তিনি। ঘটনাস্থলেই নিভে যায় তার জীবনের প্রদীপ।
আরও পড়ুনঃ সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সতর্কবার্তা, জেনে নিন প্রয়োজনে যোগাযোগের নম্বর!
আজগরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। শোকে স্তব্ধ স্ত্রী শিরিনা বেগম তিন সন্তানকে জড়িয়ে ধরে কেবল নির্বাক চেয়ে আছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে দিশেহারা মা-ও এখন বাকরুদ্ধ। একদিকে স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে প্রিয় মানুষের নিথর দেহটি শেষবারের মতো দেখার আকুলতা—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে পরিবারটি এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।
বিদেশে প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর পর লাশ ফেরানোর ক্ষেত্রে বৈধ কাগজপত্র বা ‘আকামা’ থাকা বাধ্যতামূলক। আজগর ব্যাপারী এক বছর ধরে অবৈধভাবে দেশটিতে অবস্থান করায় সৌদি কর্তৃপক্ষ ও নিয়োগকর্তার কাছ থেকে কোনো বীমা বা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশা ক্ষীণ। সাধারণত বৈধ কর্মীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড অর্থায়ন করে থাকে। কিন্তু আজগরের মতো ‘অবৈধ’ তকমা লেগে থাকা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে লাশ আনার পুরো খরচ বহন করতে হয় পরিবারকে, যা রাধানগরের এই নিঃস্ব পরিবারের পক্ষে অসম্ভব।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, দালালদের প্রতারণা আর ভিসা নবায়ন না হওয়ায় আজগরকে লুকিয়ে কাজ করতে হতো। এখন তার মরদেহ সৌদির একটি হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে। দূতাবাসের মাধ্যমে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে এবং প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান না হলে বিদেশের মাটিতেই তাকে দাফন করতে হতে পারে—এমন আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।
আজগরের এই করুণ মৃত্যু নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রতি বছর শত শত বাংলাদেশি শ্রমিক দালালদের খপ্পরে পড়ে বিদেশে গিয়ে কাগজহীন হয়ে পড়ছেন। দোহরের এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, বিদেশে যাওয়ার আগে বৈধ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা মালিকের অধীনে না থেকে ‘ফ্রি ভিসা’র নামে বাইরে কাজ করতে গিয়ে অবৈধ হয়ে পড়েন। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হলে তখন তাদের দায়ভার কেউ নিতে চায় না।
আজগরের স্ত্রী শিরিনা বেগমের আকুতি, “সরকার যেন আমার স্বামীর লাশটা দেশে আইনা দেয়। পোলাপানগুলা তো ওনার মুখটাও দেখলো না।” এটি কেবল একজনের আর্তনাদ নয়, এটি হাজারো ভাগ্যবঞ্চিত প্রবাসীর পরিবারের করুণ বাস্তবতা।











