নভেম্বর ৯, ২০২৬
#মধ্যপ্রাচ্য #স্টুডেন্ট ভিসা

মৃত্যুপুরী তেহরান থেকে ঢাকা: শিক্ষার্থী শাকিলের ২১ দিনের রুদ্ধশ্বাস প্রত্যাবর্তনের গল্প

মধ্যপ্রাচ্যের বারুদঠাঁসা আকাশ আর যুদ্ধের দামামার মাঝেই ২১ মার্চ রাতে একটি বিশেষ বিমানে ইরান থেকে দেশে ফিরেছেন ১৮৬ জন বাংলাদেশি। তাদেরই একজন শাকিল হোসেন—তেহরানের খাজা নাসির তুসি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী। তেহরান থেকে আজারবাইজান হয়ে ঢাকা পর্যন্ত তার ২১ দিনের সেই রুদ্ধশ্বাস যাত্রার গল্প কোনো রোমাঞ্চকর থ্রিলারকেও হার মানায়।

শাকিল হোসেন যখন তেহরানে তার ডরমিটরিতে বসে শেষ সেমিস্টারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনো জানতেন না কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পাল্টে যাবে চারপাশের চেনা পৃথিবী। ভূ-রাজনৈতিক সংকটে তেহরানের আকাশে যখন ড্রোনের গুঞ্জন আর ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন নিয়মিত হয়ে উঠল, তখন পড়াশোনার চেয়ে জীবন বাঁচানোটাই হয়ে দাঁড়াল মুখ্য। ২১ দিন আগে যখন প্রথম ফেরার পরিকল্পনা হয়, তখন সরাসরি ফ্লাইটের সব পথ ছিল রুদ্ধ।

শাকিল শোনালেন সেই রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা—কিভাবে প্রতিটি মুহূর্তে সাইরেনের শব্দে বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে হতো। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় সড়কপথে আজারবাইজান সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছানোর ঝুঁকি নেন তারা। শীতের কনকনে ঠান্ডা আর যুদ্ধের আতঙ্কে প্রতিটি চেকপোস্টে যেন যমদূত দাঁড়িয়ে ছিল। ২১ দিনের সেই অনিশ্চিত যাত্রার প্রতিটি রাত ছিল নির্ঘুম।

আরও পড়ুনঃ সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সতর্কবার্তা, জেনে নিন প্রয়োজনে যোগাযোগের নম্বর!

তেহরান থেকে আজারবাইজান সীমান্ত পাড়ি দেওয়া ছিল শাকিলদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শাকিলের ভাষ্যমতে, “আমরা জানতাম না পরের মোড়েই আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। আজারবাইজানে পৌঁছানোর পর যখন নীল আকাশটা দেখলাম, তখন প্রথম মনে হলো হয়তো প্রাণটা নিয়ে দেশে ফিরতে পারব।” সেখানে কয়েক দিন অপেক্ষার পর সরকারের পাঠানো বিশেষ বিমানে ওঠার মুহূর্তটি ছিল তাদের কাছে পুনর্জন্মের মতো।

১৮৬ জন বাংলাদেশির এই বহরে শাকিলের মতো আরও অনেক শিক্ষার্থী ও শ্রমিক ছিলেন। তাদের সবার চোখেই ছিল স্বজনদের কাছে ফেরার আকুতি আর যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বস্তি। ২১ মার্চ রাতে যখন বিমানটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করে, তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেক যাত্রী।

শাকিল হোসেনের এই প্রত্যাবর্তন কেবল একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত জয় নয়, এটি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় তৎপরতারও একটি প্রতিফলন। শাকিল জানান, বিদেশের মাটিতে যখন বিপদ ঘনিয়ে আসে, তখন পাসপোর্টের সবুজ রংটাই হয়ে ওঠে শেষ ভরসা। তবে যুদ্ধের কারণে তার পড়াশোনা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। মাঝপথে ক্যারিয়ার ছেড়ে চলে আসার বেদনা তাকে তাড়া করলেও, পরিবারের কাছে জীবন্ত ফিরতে পারাই এখন তার বড় পাওয়া।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার কারণে শাকিলের মতো আরও অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এখন ঝুঁকির মুখে। তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবা জরুরি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *