মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মেঘ: থমকে গেছে শ্রমবাজার, সংসদে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চলমান যুদ্ধাবস্থার প্রভাবে বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। আজ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী এ তথ্য জানান। যুদ্ধের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বেশ কিছু দেশে নতুন কর্মী নিয়োগ ও যাতায়াত সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আজকের সংসদ অধিবেশনে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশ গমন ধীর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চল সরাসরি যুদ্ধকবলিত বা সংঘাতের কাছাকাছি, সেখানে নতুন ভিসা ইস্যু এবং কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, সরকার প্রবাসীদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায় না, তাই কিছু ক্ষেত্রে কর্মী পাঠানো আপাতত সীমিত রাখা হয়েছে।
সংসদ সদস্যদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো প্রবাসীরা। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর গতি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। আমরা পরিস্থিতির ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ রাখছি।”
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেমন—লেবানন, জর্ডান এবং সিরিয়া সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা থাকলেও যুদ্ধের কারণে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে নতুন কর্মী নিতে দ্বিধাবোধ করছে। এছাড়া বিমান চলাচলের রুট পরিবর্তন এবং আকাশপথের নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক এয়ারলাইন্স তাদের ফ্লাইট সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে যারা ইতিমধ্যে ভিসা পেয়েছেন, তারাও সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না।
আরও পড়ুনঃ তিন দেশ থেকে একদিনে এলো ৩৪ প্রবাসীর মরদেহ
কেবল যাতায়াত নয়, যুদ্ধের প্রভাবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় সেখানে নতুন প্রকল্পের কাজ থমকে গেছে। ফলে নির্মাণ খাতসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শ্রমিকের যে বিশাল চাহিদা ছিল, তাতে সাময়িক স্থবিরতা নেমে এসেছে। এটি বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংসদে মন্ত্রী আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার এখন বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে দক্ষ জনবল পাঠানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইতালি, রোমানিয়া ও গ্রিসের মতো দেশগুলোর সঙ্গে নতুন করে জনশক্তি রপ্তানি চুক্তি করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
তবে মন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে যারা বর্তমানে কর্মরত আছেন, তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাংলাদেশি দূতাবাসগুলো সতর্ক রয়েছে। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে প্রবাসীদের সরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় রোডম্যাপও সরকারের হাতে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কেবল একটি সামরিক সংঘাত নয়, এটি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা। সংসদের এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সুরক্ষা এবং নতুন বাজার তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। যুদ্ধের মেঘ কেটে গেলে আবারও শ্রমবাজার চাঙ্গা হবে—এমনটাই প্রত্যাশা নীতিনির্ধারকদের।











