রেমিট্যান্সে ইতিহাসের মহাবিস্ফোরণ; মার্চে এলো রেকর্ড ৩৭৫ কোটি ডলার

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পালে নতুন হাওয়া লেগেছে। সদ্য বিদায়ী মার্চ মাসে দেশে প্রবাসী আয়ে (রেমিট্যান্স) সৃষ্টি হয়েছে এক অভূতপূর্ব রেকর্ড। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক মাসে ৩৭৫ কোটি (৩.৭৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। ঈদ উৎসব এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির ভূ-রাজনীতির প্রভাবে এই উল্লম্ফন ঘটেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক মাইলফলক হয়ে থাকবে। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের মার্চ মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলার, যা তখন পর্যন্ত ছিল সর্বোচ্চ। কিন্তু এবারের মার্চ সেই রেকর্ডকে অনেকটা অবলীলায় টপকে গেছে। শতাংশের হিসেবে এই প্রবৃদ্ধি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সাধারণত উৎসবের আগে দেশে টাকা পাঠানোর প্রবণতা বাড়ে। তবে এবার কেবল ঈদ নয়, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও রেমিট্যান্সের এই প্রবাহকে ত্বরান্বিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার ফলে প্রবাসীরা তাদের জমানো অর্থ নিরাপদ রাখতে দ্রুত দেশে পাঠাচ্ছেন।
মার্চ মাসে রেমিট্যান্সের এই জোয়ারের পেছনে দুটি প্রধান কারণকে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রথমত, পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতর। পরিবারের উৎসবের খরচ মেটাতে প্রবাসীরা প্রতি বছরই এই সময়ে বেশি অর্থ পাঠান। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে প্রবাসীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে কর্মসংস্থান বা ব্যাংকিং চ্যানেলে কোনো সমস্যা হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে অনেকেই তাদের সঞ্চিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, যুদ্ধের দামামা বাজলেও প্রবাসী আয় আসার গতি কমেনি বরং তা সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য এক ধরনের ‘ব রক্ষাকবচ’ হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করছেন ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘদিন ধরে ডলার সংকটের কারণে দেশের আমদানি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এলসি (LC) খোলা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে হাহাকার ছিল, রেমিট্যান্সের এই রেকর্ড প্রবাহ তাতে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। ডলারের সরবরাহ বাড়লে বাজারে টাকার মানের পতন ঠেকানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হবে।
তবে ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবাহ ধরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। হুন্ডি বা অবৈধ পথে অর্থ পাঠানোর হার কমাতে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের প্রতিযোগিতামূলক দাম নিশ্চিত করা জরুরি। রেমিট্যান্সের এই জোয়ার যদি আগামী কয়েক মাস অব্যাহত থাকে, তবে বছরের মাঝামাঝি নাগাদ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাবে।











