কেন বিশ্ববিদ্যার নতুন গন্তব্য ফ্রান্সের বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়?

আটলান্টিক মহাসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত ফ্রান্সের বোর্দো শহরটি কেবল তার বিশ্বখ্যাত আঙুর ক্ষেত বা স্থাপত্যশৈলীর জন্য নয়, বরং উচ্চশিক্ষার এক অনন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে। ১৪৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয় (University of Bordeaux) তার প্রায় ছয় শতাব্দীর ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সাধারণ বিদ্যাপীঠ নয়; এটি মূলত ফরাসি মেধা ও মননের এক দুর্গ। ২০১৪ সালে বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণের মাধ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি তার আধুনিক রূপ লাভ করে। এই মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞান, চিকিৎসা, আইন ও মানববিদ্যাকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসা, যাতে আন্তঃবিভাগীয় গবেষণার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
বর্তমানে প্রায় ৫৬ হাজার শিক্ষার্থীর এই মিলনমেলায় উদ্ভাবনী চিন্তা আর গবেষণার এক অদ্ভুত স্পন্দন লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়টি তার ‘আইডেক্স’ (IdEx) স্ট্যাটাসের জন্য গর্বিত, যা ফ্রান্সের কেবল হাতেগোনা কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় লাভ করে থাকে। এর অর্থ হলো, ফরাসি সরকার এই প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বমানের গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল ও স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছে।
বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠত্বের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এর বহুমুখী ল্যাবরেটরিগুলোতে। বিশেষ করে নিউরোসায়েন্স, ন্যানোটেকনোলজি এবং পরিবেশ বিজ্ঞানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত। এখানকার ‘ইনস্টিটিউট অফ ভিন অ্যান্ড ওয়াইন সায়েন্স’ (ISVV) বিশ্বের একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে আঙুর চাষ ও প্রক্রিয়াকরণকে বিজ্ঞানের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
র্যাঙ্কিংয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, ‘সাংহাই র্যাঙ্কিং’ এবং ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিং’-এ এটি নিয়মিতভাবে স্পেনের সেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমান্তরালে নিজের অবস্থান বজায় রাখে। প্রায় ৮০টিরও বেশি গবেষণা ইউনিট এবং ফরাসি জাতীয় গবেষণা সংস্থা (CNRS)-এর সাথে নিবিড় সংযোগ একে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
একনজরে বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কিছু তথ্য:
প্রতিষ্ঠাকাল: ১৪৪১ সাল (রয়্যাল ডিক্রির মাধ্যমে)।
শিক্ষার্থী সংখ্যা: প্রায় ৫৬,০০০ (যার মধ্যে ৬,০০০-এর বেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী)।
বিশেষত্ব: নিউরোসায়েন্স এবং এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সে ইউরোপের অন্যতম সেরা গবেষণা কেন্দ্র।
সাফল্য: ফরাসি সরকারের ‘ইনভেস্টমেন্ট ফর দ্য ফিউচার’ প্রোগ্রামের অধীনে বিশেষ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।
অবস্থান: ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমের নান্দনিক শহর বোর্দো, যা ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান।
বাংলাদেশের উচ্চাভিলাষী শিক্ষার্থীদের জন্য বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে মেধা বিকাশের শ্রেষ্ঠ প্রাঙ্গণ। সাধারণত উচ্চশিক্ষার জন্য ইংরেজিভাষী দেশগুলোর আকাশছোঁয়া টিউশন ফির বিপরীতে ফ্রান্সের এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টি অত্যন্ত সাশ্রয়ী। সরকারি ভর্তুকির কারণে এখানে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা লাভ করা সম্ভব হয় নামমাত্র খরচে।
স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে এখানে প্রচুর ইংরেজি মাধ্যম প্রোগ্রাম রয়েছে। বিশেষ করে যারা জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য কিংবা ডেটা সায়েন্স নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য বোর্দো এক অনন্য গন্তব্য।
বোর্দো শহরের চমৎকার আবহাওয়া এবং উন্নত জীবনযাত্রা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশের মাটিতেও এক স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করে।











