বিদেশে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি পার্ট-টাইম জবে জীবনযুদ্ধ কতটা সহজ হয়?

উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে থাকা দুই দেশ; কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। তবে কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়, পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম জবের মাধ্যমে নিজের খরচ নিজে চালানোই অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মূল লক্ষ্য। বর্তমানে এই দুই দেশের শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসায় শিক্ষার্থীদের আয়ের সুযোগ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক দশকে এই দেশ দুটিকে ‘শিক্ষার্থীদের স্বর্গরাজ্য’ মনে করা হলেও ২০২৬ সালের সমীকরণটি কিছুটা ভিন্ন। বিশেষ করে আবাসন সংকট এবং জীবনযাত্রার উচ্চমূল্য (Cost of Living) শিক্ষার্থীদের উপার্জনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
কানাডায় বর্তমানে স্টুডেন্ট ভিসায় আসা শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজের আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে (ছুটির সময় পূর্ণকালীন বা ৪০ ঘণ্টা)। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়াতেও কাজের ঘণ্টায় কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে যাতে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পড়াশোনায় ব্যাঘাত না ঘটে।
কানাডার বর্তমান শ্রমবাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, টরন্টো, ভ্যাঙ্কুভার বা অটোয়ার মতো বড় শহরগুলোতে পার্ট-টাইম জবের ব্যাপক প্রতিযোগিতা রয়েছে। খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র (Retail), ফুড সার্ভিস এবং ডেলিভারি সেক্টরে কাজ পাওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে তা অনেক সময় পর্যাপ্ত হচ্ছে না।
তবে যারা কারিগরি কাজে দক্ষ বা আইটি সেক্টরে ফ্রিল্যান্সিং করতে পারেন, তাদের জন্য আয়ের অংকটা বেশ আকর্ষণীয়। কানাডার ঠান্ডা আবহাওয়া এবং কাজের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়া অনেক সময় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।
অস্ট্রেলিয়ার প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। সিডনি, মেলবোর্ন এবং ব্রিসবেনের মতো শহরগুলোতে পর্যটন ও আতিথেয়তা (Hospitality) খাতে পার্ট-টাইম কর্মীর প্রচুর চাহিদা রয়েছে।
এখানে প্রতি ঘণ্টার ন্যূনতম মজুরি বিশ্বের অন্যতম উচ্চ স্তরে থাকায় শিক্ষার্থীরা ভালো আয় করতে পারেন। তবে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন বিভাগ এখন কাজের ওপর কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে। ক্যাশ-ইন-হ্যান্ড বা অবৈধভাবে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়লে ভিসা বাতিলের মতো কঠোর পরিণতির শিকার হতে হচ্ছে অনেককে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল কাজের আশায় বিদেশ পাড়ি দেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি সতর্ক সংকেত। দেশ ছাড়ার আগে হাতে পর্যাপ্ত তহবিল এবং কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা (যেমন—ড্রাইভিং, গ্রাফিক ডিজাইন বা কাস্টমার সার্ভিস) নিয়ে যাওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, বিদেশের মাটিতে গিয়ে কেবল অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার পার্ট-টাইম জবের বর্তমান চিত্র:
গড় মজুরি: অস্ট্রেলিয়ায় ঘণ্টায় ২৩-২৭ অস্ট্রেলীয় ডলার এবং কানাডায় ১৬-২০ কানাডীয় ডলার (প্রদেশভেদে ভিন্ন)।
জনপ্রিয় সেক্টর: গ্রোসারি শপ, কফি শপ (যেমন—টিম হর্টনস বা স্টারবাকস), লজিস্টিকস এবং কেয়ারগিভিং।
আইনি সীমা: উভয় দেশেই সেমিস্টার চলাকালীন সপ্তাহে ২০ থেকে ২৪ ঘণ্টার নির্দিষ্ট সীমা প্রযোজ্য।
আবাসন চ্যালেঞ্জ: আয়ের একটি বড় অংশ (প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ) ঘর ভাড়া মেটাতেই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
দক্ষতার গুরুত্ব: সাধারণ কাজের চেয়ে টেকনিক্যাল বা অ্যাডমিন কাজে যুক্ত হতে পারলে দেড়গুণ বেশি আয় করা সম্ভব।
কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। পার্ট-টাইম জবের বাজার এখনো বড়, তবে তা আগের মতো ‘সহজলভ্য’ নয়। শিক্ষার্থীদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, তাদের মূল উদ্দেশ্য পড়াশোনা; কাজ নয়। যারা সঠিক পরিকল্পনা এবং ন্যূনতম কারিগরি দক্ষতা নিয়ে দেশ ছাড়ছেন, তারাই কেবল এই কঠিন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন।











