প্রবাসে থেকেও দেশের কোম্পানিতে ‘রিমোট’ কাজের নতুন দিগন্ত

উচ্চশিক্ষা বা পারিবারিক কারণে বিদেশে অবস্থান করেও অনেক প্রবাসী এখন দেশের প্রথম সারির কোম্পানিগুলোতে ‘রিমোট’ বা দূরবর্তী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। ভৌগোলিক সীমানা এখন আর ক্যারিয়ারের পথে বাধা নয়। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর পরিবর্তিত কর্মসংস্কৃতির কল্যাণে মেধা পাচার রোধ এবং দেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের সম্পৃক্ত করার এই নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে।
একসময় ধারণা করা হতো, দেশ ছাড়লে দেশের শ্রমবাজারের সঙ্গে সম্পর্ক চুকে যায়। কিন্তু করোনা-পরবর্তী বিশ্বে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা ‘রিমোট ওয়ার্ক’ ধারণাটি ডালপালা মেলার পর চিত্রটি দ্রুত বদলেছে। বাংলাদেশের আইটি সেক্টর, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ই-কমার্স খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান এখন প্রবাসী দক্ষ জনবলকে খণ্ডকালীন বা পূর্ণকালীন নিয়োগ দিচ্ছে। এতে একদিকে যেমন কোম্পানিগুলো অভিজ্ঞ বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন কর্মী পাচ্ছে, অন্যদিকে প্রবাসীরাও নিজের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।
বিশেষ করে ইউরোপ বা আমেরিকায় বসবাসরত অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বা পেশাজীবী সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি দেশের সফটওয়্যার ফার্ম বা কনসালটেন্সি ফার্মগুলোতে কাজ করছেন। টাইম জোনের পার্থক্যকে অনেক ক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করছে দেশের টেক জায়ান্টরা। যখন বাংলাদেশে রাত, তখন বিদেশে থাকা কর্মীরা গ্রাহকসেবা বা টেকনিক্যাল সাপোর্ট সচল রাখছেন—ফলে কোম্পানিগুলো ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে পারছে।
আরও পড়ুনঃ সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সতর্কবার্তা, জেনে নিন প্রয়োজনে যোগাযোগের নম্বর!
এই পরিবর্তনের পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করছে। প্রথমত, সাশ্রয়ী জনবল ও বিশেষ দক্ষতা: বিদেশের বড় কোম্পানিতে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন প্রবাসী যখন দেশের প্রজেক্টে কাজ করেন, তখন তিনি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাংলাদেশে প্রবর্তন করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক সহজবোধ্যতা: বাইরের দেশের ফ্রিল্যান্সারদের তুলনায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে দেশি কোম্পানির ভাববিনিময় সহজ হয়। তৃতীয়ত, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা: জুম, স্ল্যাক বা টিমস-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখন অফিস আর ড্রয়িংরুমের দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশের স্টার্টআপ কালচার গত কয়েক বছরে যে বিশাল লাফ দিয়েছে, সেখানে প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা এক অনন্য জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে। অনেক উদ্যোক্তা মনে করছেন, দেশের মেধা দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও, তাদের শ্রম ও মস্তিষ্ককে ডিজিটাল উপায়ে ব্যবহার করা দেশের অর্থনীতির জন্যই ইতিবাচক।
মেধা পাচার (Brain Drain) রোধ: প্রবাসীরা দেশের কাজে যুক্ত থাকলে তাদের অর্জিত জ্ঞান পরোক্ষভাবে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
রেমিট্যান্সের নতুন উৎস: অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসীরা দেশের অ্যাকাউন্টে বেতন গ্রহণ করছেন, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অবদান রাখছে।
অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান: বিদেশের উন্নত কর্মপরিবেশ ও পেশাদারিত্ব দেশীয় জুনিয়র কর্মীদের শেখার সুযোগ করে দিচ্ছে।
নমনীয়তা: পূর্ণকালীন চাকরির পাশাপাশি খণ্ডকালীন পরামর্শক (Consultant) হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে এই সম্ভাবনার পথে কিছু কাঁটাও রয়েছে। কর কাঠামো, দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে আইনি জটিলতা এবং মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা অনেক সময় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এছাড়া উচ্চগতির ইন্টারনেট ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগের ওপর এই পুরো ব্যবস্থাটি নির্ভরশীল।











