নীল খাম থেকে পিক্সেলের দূরত্ব; প্রবাসীদের একাকীত্বে ভিডিও কলের প্রলেপ

সময়ের বিবর্তনে পাল্টে গেছে প্রবাস জীবনের যাপনের ধরন। এক দশক আগেও প্রবাসীদের মনের জানালা ছিল নীল খাম কিংবা অডিও ক্যাসেটে রেকর্ড করা কণ্ঠস্বর। আজ দ্রুতগতির ইন্টারনেট আর স্মার্টফোনের কল্যাণে ভিডিও কলেই সেরে নেওয়া যায় কুশল বিনিময়। তবে প্রযুক্তির এই সান্নিধ্য কি সত্যি ঘুচিয়ে দিতে পেরেছে বিদেশের মাটিতে একাকীত্বের দীর্ঘশ্বাস? প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর হাড়ভাঙা খাটুনির অন্তরালে থাকা সেই ধূসর বাস্তবতাকে নিয়েই আমাদের আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
এক সময় ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার আওয়াজে প্রবাসীদের বাড়িতে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যেত। সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপার থেকে আসা চিঠির প্রতিটি ছত্রে লেগে থাকতো বিদেশের তপ্ত রোদের গন্ধ আর প্রিয়জনদের জন্য জমানো অভিমান। সেই সময় যোগাযোগ ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা। একটি উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হতো মাসের পর মাস। বর্তমানের ভিডিও কল সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে ঠিকই, কিন্তু চিঠির সেই চিরস্থায়ী আবেগকে কি পিক্সেলের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে?
এখন প্রবাসীরা ডাইনিং টেবিলে বসে ভিডিও কল চালু করে দেশের বাড়িতে স্বজনদের সঙ্গে একসাথে ইফতার করেন কিংবা কোরবানি ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেন। কিন্তু স্ক্রিনের ওপারে থাকা প্রিয় মানুষের হাতের স্পর্শ না পাওয়া কিংবা তাদের চোখের কোণের জমে থাকা জল আড়াল করার অক্ষমতা প্রবাস জীবনের এক নতুন মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণার জন্ম দিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ‘আমিরাত-কাতারসহ ৪ দেশের প্রবাসীদের সুরক্ষার বিষয়ে পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়েছে’
ভিডিও কলে প্রবাসীরা সবসময় হাসিমুখে কথা বলেন, যাতে দেশের মানুষ দুশ্চিন্তা না করে। স্ক্রিনের বাইরে যে ঘিঞ্জি কামরায় গাদাগাদি করে থাকা, কিংবা বারো ঘণ্টার ডিউটি শেষে শরীর ফেটে পড়া ক্লান্তি—তা অনেক সময়ই নেটওয়ার্কের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। প্রবাসীরা এখন সশরীরে উপস্থিত না থেকেও বাড়ির সব সিদ্ধান্তে যুক্ত থাকছেন। কিন্তু এই ‘ভার্চুয়াল উপস্থিতি’ অনেক সময় তাদের আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তোলে। কারণ, কলটি কেটে দেওয়ার পরেই বিশাল ফ্ল্যাট বা ছোট মেসে জেঁকে বসে বিদেশের সেই নিস্তব্ধতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিডিও কল যোগাযোগের গতি বাড়ালেও প্রবাসীদের ওপর এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। আগে যেখানে মাসে একবার কথা হতো, এখন দিনে দশবার কথা না হলে বাড়িতে দুশ্চিন্তার পাহাড় জমে। এতে প্রবাসীদের কাজের মনোসংযোগে যেমন ব্যাঘাত ঘটে, তেমনি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানসিক স্বস্তিও সংকুচিত হয়ে আসে।
প্রবাস জীবনের বিবর্তন: কিছু বিশেষ তথ্য
যোগাযোগের মাধ্যম: নব্বইয়ের দশকে চিঠি ও ক্যাসেট, ২০০০-এর দশকে পিএসটিএন বা কলিং কার্ড, আর বর্তমানে হোয়াটসঅ্যাপ-ইমো-মেসেঞ্জার।
একাকীত্বের ধরন: আগে ছিল তথ্যের অভাবজনিত একাকীত্ব, আর এখন হলো সশরীরে উপস্থিত থাকতে না পারার আফসোস।
সামাজিক প্রভাব: ভিডিও কলের কারণে প্রবাসীরা এখন দেশের রাজনীতি ও পারিবারিক খুঁটিনাটি বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন, যা তাদের বিচ্ছিন্নতাবোধ কিছুটা কমায়।
মানসিক স্বাস্থ্য: স্ক্রিন টাইম বাড়ার ফলে ঘুমের অভাব এবং সবসময় অনলাইনে থাকার বাধ্যবাধকতা প্রবাসীদের মধ্যে দুশ্চিন্তার প্রকোপ বাড়াচ্ছে।
প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, মানুষের সাহচর্য কোনো কিছুর বিকল্প হতে পারে না। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরলেও, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের খবর রাখার মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আমাদের দেশে এখনো অপর্যাপ্ত। ভিডিও কল কেবল যোগাযোগের একটি সেতু হতে পারে, কিন্তু প্রিয়জনের কোল বা দেশের মাটির গন্ধ তার কাছে অধরাই থেকে যায়।











