ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা আর নয়? ই-পাসপোর্ট নবায়নে আসছে বড় স্বস্তি!

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির দীর্ঘদিনের প্রধান ক্ষোভ ও ভোগান্তির কারণ ই-পাসপোর্ট নবায়ন জটিলতা। এই সংকট নিরসনে অবশেষে পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে বেশ কিছু কার্যকর ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সমাধান চালু করতে যাচ্ছে, যা প্রবাসীদের পাসপোর্ট প্রাপ্তি দ্রুত ও সহজতর করবে।
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের বিদেশের মাটিতে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের পাসপোর্ট। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে ই-পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ কিংবা মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
কখনো সার্ভার জটিলতা, কখনো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা জন্মনিবন্ধনের তথ্যের অমিল, আবার কখনো দূতাবাসগুলোতে জনবল সংকটের কারণে মাসের পর মাস আটকে থাকছে পাসপোর্ট। এর ফলে বহু প্রবাসী চাকরি হারাচ্ছেন, কেউ কেউ হয়ে পড়ছেন অবৈধ। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতেই এবার নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর (ডিআইপি) সূত্রে জানা গেছে, প্রবাসীদের এই ভোগান্তি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে ডিজিটাল ও প্রশাসনিক স্তরে বড় ধরনের সংস্কার আনা হচ্ছে। এখন থেকে তথ্যের সামান্য ভুলের জন্য কোনো প্রবাসীর আবেদন আটকে রাখা হবে না, বরং তা দ্রুত সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ ‘ওয়ান-স্টপ’ অনলাইন উইন্ডো তৈরি করা হচ্ছে।
প্রযুক্তির ছোঁয়া ও দূতাবাসগুলোর আধুনিকায়ন
আমাদের কূটনৈতিক মিশনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি প্রবাসীকে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এই সংকট দূর করতে বিদেশের বড় বড় শ্রমবাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে বুথের সংখ্যা দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সাথে ই-পাসপোর্টের বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ ও চোখের মণি স্ক্যান) দেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে যুক্ত করা হচ্ছে আধুনিক মোবাইল কিওস্ক মেশিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রবাসীদের আর কর্মদিবস নষ্ট করে দূর-দূরান্ত থেকে দূতাবাসে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। তাছাড়া, নতুন এই নিয়মে ই-পাসপোর্ট প্রিন্ট হওয়ার পর তা প্রবাসীদের ঠিকানায় সরাসরি কুরিয়ারের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
ভোগান্তি কমাতে নতুন সমাধানের মূল দিকগুলো:
ডাটাবেজ সমন্বয়: এনআইডি এবং জন্মনিবন্ধন সার্ভারের সাথে পাসপোর্ট ডাটাবেজের সরাসরি ও দ্রুত সংযোগ স্থাপন, যাতে তথ্যের অমিল সহজে দূর করা যায়।
মোবাইল এনরোলমেন্ট কিওস্ক: যেসব দূরবর্তী অঞ্চলে বাংলাদেশিরা বেশি কাজ করেন, সেখানে ভ্রাম্যমাণ গাড়ির মাধ্যমে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করা।
অনলাইন ট্র্যাকিং ও এসএমএস অ্যালার্ট: আবেদনের কোন পর্যায়ে পাসপোর্টটি রয়েছে, তা ঘরে বসেই প্রবাসীরা যেন নির্ভুলভাবে জানতে পারেন, তার জন্য চ্যাটবট ও স্বয়ংক্রিয় মেসেজ সার্ভিস।
দূতাবাসে উইকএন্ড সেবা: কর্মজীবী প্রবাসীদের সুবিধার্থে অনেক দেশে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও (শুক্র বা শনিবার) পাসপোর্ট সেবা চালু রাখার পরিকল্পনা।
পাসপোর্ট একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও বিদেশের মাটিতে তার আত্মপরিচয়। বছরের পর বছর ধরে প্রবাসীরা দেশের জন্য রক্ত পানি করা অর্থ পাঠালেও, একটি পাসপোর্টের জন্য তাদের যেভাবে দূতাবাসের বারান্দায় ঘুরতে হয়, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। দেরিতে হলেও ই-পাসপোর্ট নবায়নের এই কার্যকর সমাধানগুলো প্রবাসীদের মনে আশার আলো জাগিয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে, যেকোনো চমৎকার পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করে তার সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। নতুন এই প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক উদ্যোগগুলো যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে আটকে না পড়ে, তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে। প্রবাসীদের পাসপোর্ট সেবা যত দ্রুত ও দুর্নীতিমুক্ত হবে, দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ততই উজ্জ্বল হবে।











