ইউরোপে পিআর: জেনে নিন কোন দেশগুলোর নিয়ম সবচেয়ে শিথিল

বর্তমানে বৈধভাবে ইউরোপে পিআর বা স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখছেন বহু অভিবাসী ও পেশাজীবী। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সব দেশের অভিবাসন আইন এক নয়; কিছু দেশের নিয়ম তুলনামূলকভাবে বেশ শিথিল। বিশেষ করে দক্ষ কর্মী, ফ্রিল্যান্সার বা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য কিছু রাষ্ট্র চমৎকার সুযোগ দিচ্ছে। ২০২৬ সালে এসে কোন দেশগুলোতে সহজে স্থায়ী আবাসন পাওয়া সম্ভব, তা নিচে আলোচনা করা হলো।
জার্মানি তাদের অভিবাসন আইন ব্যাপকভাবে সংস্কার করে ‘স্কিলড ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট’ বা দক্ষ কর্মী অভিবাসন আইন চালু করেছে। এর আওতায় ‘চান্সেনকার্তে’ বা অপরচুনিটি কার্ডের মাধ্যমে পয়েন্ট ভিত্তিক পদ্ধতিতে চাকরি ছাড়াই দেশটিতে গিয়ে কাজ খোঁজার সুযোগ মিলছে। বিশেষ করে যারা আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং বা স্বাস্থ্য খাতে অভিজ্ঞ, তারা খুব দ্রুত ইইউ ব্লু কার্ড পাচ্ছেন।
জার্মানিতে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে এবং জার্মান ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান থাকলে মাত্র ২১ থেকে ৩৩ মাসের মধ্যে স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি ইউরোপে পিআর পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে দ্রুততম এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য একটি প্রক্রিয়া। বিশ্বমানের শিক্ষা এবং উন্নত জীবনযাত্রার কারণে বহু মানুষ এই রুটটি বেছে নিচ্ছেন।
ইউরোপের মধ্যে পর্তুগাল দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসীবান্ধব দেশ হিসেবে পরিচিত। যাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ স্থায়ী বা নিষ্ক্রিয় মাসিক আয় (যেমন পেনশন বা ডিভিডেন্ড) রয়েছে, তারা ডি৭ ভিসার মাধ্যমে দেশটিতে থাকার চমৎকার সুযোগ পাবেন। এর জন্য প্রতি মাসে ন্যূনতম ৯২০ ইউরোর মতো নিজস্ব আয় দেখাতে হয়।
পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার বা রিমোট ওয়ার্কারদের জন্য রয়েছে ডি৮ বা ডিজিটাল নোম্যাড ভিসা, যেখানে প্রতি মাসে প্রায় ৩,৬৮০ ইউরো আয় দেখাতে হয়। পর্তুগালে বৈধভাবে ৫ বছর বসবাসের পর স্থায়ী নাগরিকত্ব বা পিআর-এর আবেদন করা যায়। এই দীর্ঘ সময়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় পর্তুগালের নিয়মগুলো বেশ নমনীয় থাকে, যা সাধারণ চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুযোগ।
আয়ারল্যান্ডের ‘ক্রিটিক্যাল স্কিলস এমপ্লয়মেন্ট পারমিট’ ইউরোপের অন্যতম দ্রুততম পিআর রুট হিসেবে পরিচিত। দেশটির চাহিদাসম্পন্ন পেশার তালিকায় যদি আপনার চাকরি থাকে, তবে মাত্র ২ বছর কাজ করার পরই ‘স্ট্যাম্প ৪’ বা স্থায়ী বসবাসের মর্যাদা পাওয়া যায়। আয়ারল্যান্ডে বড় বড় বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সদর দফতর থাকায় কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র মাল্টা তাদের কর্মসংস্থান এবং স্থায়ী বসবাসের ক্ষেত্রে নমনীয় নীতি বজায় রেখে চলেছে। মাল্টায় নির্দিষ্ট ট্যাক্স রেসিডেন্সি বা কাজের মাধ্যমে সহজেই স্থায়ী আবাসন নিশ্চিত করা যায়। ইংরেজি প্রধান ভাষা হওয়ায় আয়ারল্যান্ড ও মাল্টা উভয় দেশেই দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জন্য খাপ খাইয়ে নেওয়া সহজ।
স্পেন তাদের ‘নন-লুকরে ভিসা’ এবং ‘ডিজিটাল নোম্যাড ভিসা’ দিয়ে বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছে। নন-লুকরে ভিসার মাধ্যমে স্পেনে কাজ না করেও শুধু নিজস্ব সঞ্চয় বা আয় দেখিয়ে থাকা সম্ভব, যার জন্য মাসে প্রায় ২,৪০০ ইউরো আয়ের প্রমাণ লাগে। স্পেনের চমৎকার আবহাওয়া এবং সাশ্রয়ী জীবনযাত্রা একে অভিবাসীদের পছন্দের শীর্ষে রেখেছে।
সাইপ্রাসও বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত চমৎকার এবং শিথিল একটি কর ব্যবস্থা অফার করে। দেশটিতে মাত্র সাড়ে বারো শতাংশ কর্পোরেট ট্যাক্স রয়েছে এবং এখানে কোনো উপহার বা উত্তরাধিকার কর নেই। ফলে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা সাইপ্রাসকে বেছে নিয়ে দ্রুত স্থায়ী রেসিডেন্সি নিশ্চিত করছেন।
পূর্ব ইউরোপের লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়া বর্তমান সময়ে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। লাটভিয়ায় মাত্র ৫০ হাজার ইউরো কোনো স্থানীয় কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে বসবাসের অনুমতি পাওয়া যায়, যা ইউরোপের অন্যতম সস্তা গোল্ডেন ভিসা রুট। এই প্রক্রিয়ায় খুব কম সময়ে আইনি জটিলতা ছাড়াই থাকার অনুমতি মেলে।
এস্তোনিয়া তাদের ডিজিটাল প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের স্বাগত জানাচ্ছে। তাদের ডিজিটাল নোম্যাড ভিসার শর্তগুলো অত্যন্ত স্বচ্ছ। এই দেশগুলো ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি জীবনযাত্রার খরচও উত্তর বা পশ্চিম ইউরোপের চেয়ে অনেক কম রাখে।
জার্মানি এবং আয়ারল্যান্ডে সবচেয়ে কম সময়ে পিআর পাওয়া সম্ভব। জার্মানিতে দক্ষ কর্মীরা ২১ থেকে ৩৩ মাসের মধ্যে এবং আয়ারল্যান্ডে ক্রিটিক্যাল স্কিলস পারমিটধারীরা মাত্র ২ বছরের মধ্যে স্থায়ী আবাসন নেন।
বড় বিনিয়োগ ছাড়া ইউরোপে থাকার জন্য ডিজিটাল নোম্যাড ভিসা বা প্যাসিভ ইনকাম ভিসা সবচেয়ে ভালো উপায়। পর্তুগালের ডি৭ বা স্পেনের নন-লুকরে ভিসার মাধ্যমে নির্দিষ্ট মাসিক আয় দেখিয়ে সহজেই পিআর-এর পথ সুগম করা যায়।
জার্মানির মতো দেশে দ্রুত পিআর পেতে ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান (যেমন B1 স্তর) প্রয়োজন হয়। তবে আয়ারল্যান্ড বা মাল্টার মতো ইংরেজি প্রধান দেশগুলোতে আলাদা কোনো স্থানীয় ভাষা শেখার বাধ্যবাধকতা থাকে না, ফলে সেখানে প্রক্রিয়াটি সহজ হয়।











