ইউরোপে শিক্ষার্থীর আয় থেকে ট্যাক্স ও ইন্স্যুরেন্স কাটার আসল হিসাব

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি পার্ট-টাইম চাকরি করা বাংলাদেশি তরুণদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তবে অনেক শিক্ষার্থীই দেশ ছাড়ার আগে হিসাব করতে ভুল করেন যে ইউরোপে শিক্ষার্থীর আয় কিন্তু পুরোপুরি নিজের পকেটে আসে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর কড়া আইনি কাঠামোর কারণে গ্রস বা মোট বেতন থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ ট্যাক্স, সামাজিক নিরাপত্তা খাত এবং স্বাস্থ্য বীমা বাবদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়া হয়। দেশভেদে এই করের হার এবং নিয়মকানুন এতটাই ভিন্ন যে সঠিক ধারণা না থাকলে মাস শেষে ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখে অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীই বেশ বড়সড় ধাক্কা খান।
ইউরোপের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুই গন্তব্য জার্মানি এবং ফ্রান্সে করের নিয়ম দুই রকম। জার্মানিতে কোনো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী যদি ২০ ঘণ্টার খণ্ডকালীন চাকরি করেন এবং তার মাসিক আয় ট্যাক্স ফ্রি সীমা অতিক্রম করে, তবে তাকে ট্যাক্স ক্লাস ১ (Tax Class 1) এর অধীনে কর দিতে হয়। এখানে পেনশন ফান্ড এবং বেকারত্ব বীমা বাবদ প্রায় ২০% পর্যন্ত অর্থ চলে যেতে পারে। অন্যদিকে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের জন্য বার্ষিক আয়ের একটি বড় অংশ আয়কর মুক্ত থাকে। তবে সেখানেও সামাজিক নিরাপত্তা বা ‘কোতিজাসিওঁ সোসিয়াল’ (Cotisations Sociales) বাবদ গ্রস বেতনের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ টাকা কেটে রাখা সাধারণ নিয়ম।
ইউরোপীয় দেশগুলোতে স্বাস্থ্য বীমা থাকা শুধু আইনি বাধ্যবাধকতাই নয়, এটি আপনার প্রতি মাসের খরচের একটি বড় খাত। যেমন নেদারল্যান্ডস বা জার্মানিতে পাবলিক হেলথ ইন্স্যুরেন্সের জন্য একজন শিক্ষার্থীকে প্রতি মাসে প্রায় ১২০ থেকে ১৪০ ইউরো গুনতে হয়। কিছু দেশে পার্ট-টাইম চাকরি শুরু করলে এই ইন্স্যুরেন্সের খরচ সরাসরি কোম্পানির বেতনের শিট থেকে কেটে নেওয়া হয়। এর ফলে ইউরোপে শিক্ষার্থীর আয় প্রথম দেখায় যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, সব ধরনের সরকারি লেভি ও বীমা পরিশোধের পর হাতে থাকা নেট বা প্রকৃত বেতনের অঙ্কটি তার চেয়ে অনেকটাই কমে আসে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সাধারণত সেমিস্টার চলাকালীন সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজ করার আইনি অনুমতি থাকে। এই ২০ ঘণ্টার সীমা পার হলে ট্যাক্সের হার এক লাফে অনেক বেড়ে যায়, কারণ তখন শিক্ষার্থীকে আর ‘ফুল-টাইম স্টুডেন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। ইউরোপের ট্যাক্স ব্র্যাকেটগুলো আয়ের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। তাই আপনি যত বেশি শিফট বা ওভারটাইম করবেন, আপনার ট্যাক্স কাটার হারও তত বেশি জ্যামিতিক হারে বাড়বে। এই কারণে অনেক অভিজ্ঞ শিক্ষার্থীই আইনি সীমার মধ্যে থেকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি আয় না করার কৌশল বেছে নেন।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্বস্তির খবর হলো, প্রতি বছর নিয়ম মেনে ট্যাক্স রিটার্ন বা ‘ট্যাক্স ডিক্লেয়ারেশন’ সাবমিট করলে কেটে নেওয়া টাকার একটি বড় অংশ ফেরত পাওয়া যায়। যেহেতু খণ্ডকালীন কর্মীরা পুরো বছর একটানা ফুল-টাইম কাজ করেন না, তাই সরকার তাদের বার্ষিক গড় আয় হিসাব করে অতিরিক্ত কেটে নেওয়া অ্যাডভান্স ট্যাক্স রিফান্ড করে দেয়। এর জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসের পে-স্লিপ বা বেতনের রসিদ এবং ইন্স্যুরেন্সের কাগজপত্র যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করতে হবে। সঠিক সময়ে স্থানীয় কর অফিসে আবেদন করলে এই অর্থ সরাসরি শিক্ষার্থীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যায়।
এই বিষয়ের সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. ট্যাক্স ফ্রি সীমার নিচে আয় করলেও কি ইন্স্যুরেন্সের টাকা কাটবে?
হ্যাঁ, ট্যাক্স ফ্রি সীমার নিচে আয় করলে আপনার আয়কর বা ইনকাম ট্যাক্স হয়তো শূন্য হবে, কিন্তু হেলথ ইন্স্যুরেন্স এবং সোশ্যাল সিকিউরিটি কন্ট্রিবিউশন বাধ্যতামূলক। ইউরোপের অধিকাংশ দেশে চাকরি করার অর্থই হলো আপনাকে সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে অবদান রাখতে হবে, যা আপনার আপদকালীন চিকিৎসার খরচ মেটায়।
২. ইউরোপে স্টুডেন্ট হিসেবে কত টাকা পর্যন্ত করমুক্ত আয় করা যায়?
এটি সম্পূর্ণভাবে দেশের ওপর নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানিতে ২০২৬ সালের নিয়ম অনুযায়ী বার্ষিক প্রায় ১১,৭৮৪ ইউরো পর্যন্ত আয় করলে কোনো আয়কর দিতে হয় না। ফ্রান্সেও শিক্ষার্থীদের জন্য বার্ষিক ৩-৪ মাসের ন্যূনতম বেতনের সমপরিমাণ অর্থ করের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
৩. ক্যাশে বা অনথিভুক্ত কাজ করলে কি ট্যাক্স এড়ানো সম্ভব?
ইউরোপের দেশগুলোতে ক্যাশে বা ইলিগাল কাজ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। ধরা পড়লে ভারী জরিমানাসহ স্টুডেন্ট ভিসা বাতিল এবং দেশ থেকে বহিষ্কারের (Deportation) মতো মারাত্মক সাজা হতে পারে। বৈধ উপায়ে কাজ করে ট্যাক্স দেওয়ার মাধ্যমেই ইউরোপে শিক্ষার্থীর আয় সুরক্ষিত ও আইনি রাখা সম্ভব।










