ব্যাচেলর বনাম মাস্টার্স স্কলারশিপ: কোনো পথে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বেশি?

উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাতে চাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মূল চিন্তার জায়গা থাকে অর্থায়ন, যেখানে ব্যাচেলর বনাম মাস্টার্স স্কলারশিপ পাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা নিয়ে সবচেয়ে বড় দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়। উচ্চমাধ্যমিক পাসের পরপরই পূর্ণাঙ্গ অর্থায়ন পেয়ে উন্নত কোনো দেশের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যতটুকু চ্যালেঞ্জিং, স্নাতক শেষে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে সেই একই স্কলারশিপ পাওয়া তারচেয়ে অনেকগুণ বেশি সহজ ও বাস্তবসম্মত। বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণার বাজেট, ফান্ডিং সোর্স এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার মানদণ্ড বিশ্লেষণ করলে এই দুই ধাপের স্কলারশিপের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান দৃশ্যমান হয়।
ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর বিদেশে ফুল-ফ্রি ব্যাচেলর স্কলারশিপ পাওয়া এক প্রকার বিরল অর্জনের সমতুল্য। একে তো আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্সগুলো ৩ থেকে ৪ বছর মেয়াদি হয়, যার ফলে ফান্ডিংয়ের অংক অনেক বড় দাঁড়ায়; অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ আবেদনের বিপরীতে স্কলারশিপের আসন থাকে সামান্য। যুক্তরাষ্ট্রের আইভি লিগ কিংবা নির্দিষ্ট কিছু গ্লোবাল ডাইভারসিটি স্কলারশিপ ছাড়া ব্যাচেলর পর্যায়ে শতভাগ টিউশন ফি মওকুফ এবং উপবৃত্তি পাওয়া অত্যন্ত শক্ত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা শুধু আংশিক টিউশন ফি ছাড় (Merit Scholarship) পেয়ে থাকেন, যা দিয়ে টিউশন ফির বাকি অংশ ও জীবনযাত্রার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
অনার্স শেষ করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে আবেদনকারীদের জন্য বৈদেশিক স্কলারশিপের পরিধি বহুগুণ বড়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফ্ল্যাগশিপ ফান্ডিং প্রোগ্রাম যেমন—যুক্তরাজ্যের চেভনিং, ইউরোপের ইরাসমাস মুন্ডুস, জার্মানির ড্যাড (DAAD), অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ডস কিংবা আমেরিকার ফুলব্রাইট সবই স্নাতকোত্তর ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার জন্য নিবেদিত। এসব স্কলারশিপে টিউশন ফির পাশাপাশি বিমান ভাড়া, আবাসন খরচ, হেলথ ইন্স্যুরেন্স এবং মাসিক সম্মানজনক উপবৃত্তি অন্তর্ভুক্ত থাকে। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রফেসরের সাথে সরাসরি রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (RA) বা টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (TA) হিসেবে কাজ করে পড়ার খরচ বাগে আনার পথও বেশ উন্মুক্ত।
ইন্টারমিডিয়েট লেভেলে একজন শিক্ষার্থীর প্রোফাইলে শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ফল এবং আইইএলটিএস বা স্যাটের স্কোর ছাড়া আর তেমন কিছু যুক্ত করার থাকে না। এতে আবেদনকারীদের পৃথকভাবে চেনা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু ব্যাচেলর শেষ করা একজন শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে গবেষণাপত্র প্রকাশ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টার্নশিপ, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন প্রজেক্টে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান। এই অতিরিক্ত যোগ্যতাগুলো বিশ্ববিদ্যালয় বা সিলেকশন কমিটিকে সহজেই আশ্বস্ত করে যে, ওই শিক্ষার্থী তাদের গবেষণা ও প্রজেক্টে মূল্যবান অবদান রাখতে পারবেন। ফলে ফান্ডের সঠিক বণ্টন নিশ্চিত করতে প্রফেশনাল ও অ্যাকাডেমিক পরিপক্বতা থাকা স্নাতকোত্তরদেরই প্রাধান্য দেওয়া হয়।
পড়াশোনার সময়কাল এবং ব্যয়ের হিসাব বিবেচনা করলেও মাস্টার্স স্কলারশিপ অর্জনের যৌক্তিকতা স্পষ্ট হয়। ব্যাচেলর ডিগ্রি সম্পন্ন করতে সাধারণত ৪ বছর লাগে, যেখানে টিউশন ও লিভিং কস্ট মিলে বিশাল অঙ্কের বাজেটের প্রয়োজন হয়। কোনো স্কলারশিপে ফান্ডিং কাটছাঁট হলে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের ওপর যে অর্থনৈতিক চাপ পড়ে, তা সামাল দেওয়া কঠিন। পক্ষান্তরে, মাস্টার্স প্রোগ্রাম মাত্র ১ থেকে ২ বছর মেয়াদি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুব সহজেই একজন শিক্ষার্থীর পূর্ণ আর্থিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে। সংগত কারণেই আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের বৈশ্বিক বাজেটের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই মাস্টার্স ও পিএইচডি স্তরে বরাদ্দ করা হয়ে থাকে।











