নরওয়েতে টিউশন ফি বাতিলের উদ্যোগ: বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় ফিরছে সোনালী সুযোগ

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নরওয়েতে টিউশন ফি পুনরায় মওকুফ বা উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর এক নতুন নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের (Non-EU) শিক্ষার্থীদের জন্য ফি আরোপের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে আবেদনের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে যায়। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটির রাজনৈতিক ও শিক্ষাবিদ মহলে ফি সংস্কারের এই উদ্যোগ নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে নরওয়ে ছিল ইউরোপের হাতে গোনা কয়েকটি দেশের একটি, যেখানে বিশ্বজুড়ে যেকোনো নাগরিকের জন্য টিউশন ফি ছাড়াই উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল। তবে ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশটির সরকার অ-ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের ওপর উচ্চমাত্রার ফি চাপিয়ে দেওয়ার নিয়ম বাস্তবায়ন করে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য নরওয়ের দরজা অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে যায়।
ফি চালুর পর প্রথম বছরেই দেশটির খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের এনরোলমেন্ট ব্যাপকভাবে কমে আসে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জানায় যে, গবেষণার মান বজায় রাখা এবং বহুসাংস্কৃতিক ক্যাম্পাস জীবন ধরে রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের গবেষণাগারগুলোতে বিশ্বমানের শিক্ষার্থী সংকটের মুখে পড়তে হয়।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে নরওয়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ও শিক্ষার্থী ইউনিয়নগুলো সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লাগাতার তোপ দাগাতে থাকে। তাদের স্পষ্ট দাবি ছিল, উচ্চশিক্ষাকে ব্যবসার মাধ্যম না বানিয়ে মেধার বৈশ্বিক বিকাশ ঘটাতে নরওয়ের ঐতিহ্যবাহী বিনামূল্যে শিক্ষা নীতি ফিরিয়ে আনা হোক। এই বাণিজ্যিকীকরণের ফলে নরওয়ের উচ্চশিক্ষা খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছিল।
সম্প্রতি নরওয়েজিয়ান শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও নীতি নির্ধারকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই উদ্বেগ গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়েছেন। বর্তমান পার্লামেন্টে নীতিগত পরিবর্তনের জন্য যে সংস্কার প্রস্তাব আনা হয়েছে, তাতে টিউশন ফি পুরোপুরি বাতিল কিংবা নামমাত্র ফি নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলও তরুণ মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে এই সংস্কারে নীতিগত সম্মতি জানিয়েছে।
বাঙালি শিক্ষার্থীদের কাছে ইউরোপের মধ্যে নরওয়ে সবসময়ই অন্যতম পছন্দের গন্তব্য ছিল। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিশ্বমানের ডিগ্রি অর্জন এবং পড়াশোনা শেষে চাকরির সুযোগ থাকার কারণে প্রতি বছর হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নরওয়েতে পাড়ি জমাতেন। তবে ২০২৩ সালের টিউশন ফি আরোপের পর সেই প্রবাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।
নতুন করে নরওয়েতে টিউশন ফি বাতিল বা কমানোর প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এটি এক বিশাল সুযোগ তৈরি করবে। আইইএলটিএস (IELTS) পয়েন্ট এবং ভালো একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলে টিউশন ফির চিন্তা ছাড়াই সরাসরি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান জীবনমানের স্বাদ নেওয়ার দুয়ার আবার খুলে যাবে। বিশেষ করে মাস্টার্স এবং গবেষণানির্ভর প্রোগ্রামে ভর্তির হার বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
শিক্ষা খাতের এই ইতিবাচক পরিবর্তনের রূপরেখা খুব শীঘ্রই নরওয়েজিয়ান সরকারের অফিশিয়াল পোর্টালে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীরা নতুন নিয়মে আবেদন করার সুবিধা পেতে পারেন বলে আভাস পাওয়া গেছে। তাই প্রার্থীরা এখন থেকেই তাঁদের নথিপত্র প্রস্তুত রাখা শুরু করতে পারেন।
উচ্চশিক্ষায় নরওয়ের এই নমনীয় অবস্থান ইউরোপের অন্যান্য দেশের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রবাসে মেধা বিকাশ ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিং তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে নরওয়ে আবারও তার অবস্থান শক্ত করছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচিত এই সুযোগ কাজে লাগাতে এখন থেকেই একাডেমিক রেজাল্ট এবং প্রয়োজনীয় ভাষা দক্ষতার প্রস্তুতি জোরদার করা।











