গ্রিসে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কর্মী প্রেরণ শুরু, যাচ্ছে কৃষিকর্মী ও হোটেল স্টাফ

ইউরোপের শ্রমবাজারে নতুন অধ্যায় সূচনা করে গ্রিসে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কর্মী প্রেরণ কার্যক্রম পুরোদমে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ ও গ্রিস সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় রাষ্ট্রীয় জনশক্তি রপ্তানিকারক সংস্থা বোয়েসেল অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে কর্মী পাঠানোর এই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে বাছাইকৃত শত শত কর্মী বৈধ ভিসা নিয়ে দেশটির রাজধানী এথেন্স ও পর্যটনসমৃদ্ধ ক্রিট অঞ্চলের খামারগুলোতে সরাসরি কাজে যোগ দিয়েছেন। নামমাত্র খরচে ইউরোপে কর্মসংস্থানের এমন সুবর্ণ সুযোগ অভিবাসন খাতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো সদস্য রাষ্ট্রের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক শ্রমচুক্তি। ২০২২ সালে ঢাকায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তির পর থেকেই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল মাঠপর্যায়ে কর্মী নির্বাচন ও যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করছে। মূলত গ্রিসের স্থানীয় কৃষিমৌসুম ও পর্যটন চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সে দেশের নিয়োগকর্তারা বোয়েসেলের কাছে নির্দিষ্ট চাহিদাপত্র পাঠাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, গ্রিসে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কর্মী প্রেরণ শুধু কর্মসংস্থানই নিশ্চিত করছে না, বরং অভিবাসন ব্যয়কেও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নামিয়ে এনেছে। উন্মুক্ত অনলাইন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ করে মেধা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কর্মী বাছাই করা হচ্ছে। ফলে দুর্গম গ্রামের পরিশ্রমী কৃষিজীবী তরুণরাও কোনো বাড়তি অর্থ খরচ না করে সরাসরি কাজের ভিসা হাতে পাচ্ছেন।
গ্রিসে যাওয়া কর্মীরা দেশটির গ্রামীণ এলাকার ফলমূল বাগান, আধুনিক গ্রিনহাউস ও অলিভ খামারে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করছেন। এর পাশাপাশি ক্রিট দ্বীপসহ প্রধান পর্যটন এলাকাগুলোর হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ খাতেও বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয় শ্রম আইন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিধিবিধান অনুযায়ী কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, কাজের পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবীমার আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে।
কর্মস্থলে যোগ দেওয়া শ্রমিকরা জানান, ইউরোপীয় খামারগুলোতে কাজের পরিবেশ যেমন আধুনিক, তেমনই পারিশ্রমিকও সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছে। উপার্জিত অর্থ দ্রুত ও নিরাপদে দেশে স্বজনদের কাছে পাঠানো সহজ হওয়ায় কর্মীদের মনোবল বেশ চাঙ্গা। অন্যদিকে, বাংলাদেশি শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রম ও নিয়মানুবর্তিতায় সন্তোষ প্রকাশ করছেন গ্রিক নিয়োগকর্তারাও।
বিগত বছরগুলোতে ভালো উপার্জনের আশায় দালালের খপ্পরে পড়ে ইউরোপের সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বহু তরুণের সলিলসমাধি ঘটেছে। লাখ লাখ টাকা খুইয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে শত শত পরিবার। এই নির্মম বাস্তবতায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় ইউরোপের এই দরজা খুলে যাওয়া একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রিসে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কর্মী প্রেরণ কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে গতিশীল থাকলে দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য শ্রমবাজারেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে। রোমানিয়া, ইতালি বা সার্বিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গেও ভবিষ্যতে এই ধরনের কাঠামোগত সরকারি চুক্তির পথ তৈরি হতে পারে। এর ফলে অবৈধ পথে মানবপাচারের আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়বে।
গ্রিসে গমনেচ্ছু কর্মীদের কেবলমাত্র বোয়েসেলের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ও সরকারি বিজ্ঞপ্তির তথ্যে আস্থা রাখার তাগিদ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফেসবুকে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর চটকদার বিজ্ঞাপন কিংবা ট্রাভেল এজেন্সির ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খাতের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, শারীরিক সুস্থতা ও হালনাগাদ পাসপোর্ট থাকা আবশ্যক।
নিয়োগের ক্ষেত্রে বোয়েসেলের নির্ধারিত সার্ভিস চার্জ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ফি ও নির্ধারিত বিমানভাড়া ছাড়া কোনো অতিরিক্ত লেনদেন নিষিদ্ধ। চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময় কাজ শেষে আইন মেনে দেশে ফিরে আসার শর্ত সঠিকভাবে পালন করলে পরবর্তী মৌসুমেও একই কর্মীর জন্য নতুন সুযোগের পথ উন্মুক্ত থাকবে।











