কিচেন থেকে করপোরেট: বিশ্বজুড়ে আলো ছড়াচ্ছেন প্রবাসী নারীরা

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের মূলধারার অর্থনীতিতে নিজেদের অদম্য মেধা ও ব্যবসায়িক দক্ষতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করছেন প্রবাসী নারীরা। প্রবাস জীবনের চিরাচরিত গণ্ডি পেরিয়ে রান্নাঘর থেকে শুরু করে করপোরেট বোর্ডরুম—সবখানেই এখন তাঁদের বলিষ্ঠ পদচারণা দৃশ্যমান। তৈরি পোশাক, দেশীয় হস্তশিল্প, প্রযুক্তি সেবা ও খাদ্যপণ্যে গড়ে তোলা এসব প্রতিষ্ঠান কেবল বিদেশের মাটিতেই সমাদৃত হচ্ছে না, বরং নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠিয়ে সমৃদ্ধ করছে বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও।
বিদেশের মাটিতে একসময় অভিবাসী নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল মূলত গৃহস্থালি কাজের পরিমণ্ডলে। সেই চেনা সমীকরণ ভেঙে এখন দৃশ্যপট বদলে গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে। অনেকেই নিজেদের ঘরের রান্নাঘরে কেটারিং বা দেশীয় ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি তৈরির ছোট উদ্যোগ নিয়ে প্রথম ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সেই প্রাথমিক প্রচেষ্টাই মেধা ও অধ্যবসায়ের জোরে কয়েক বছরের ব্যবধানে রূপ নিয়েছে পূর্ণাঙ্গ রেস্তোরাঁ চেইন কিংবা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের সফল ব্র্যান্ডে।
লন্ডন, টরন্টো কিংবা নিউইয়র্কের মতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে একজন প্রবাসী নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের শক্ত ভিত গড়ে তোলা মোটেও সহজ কোনো যাত্রা ছিল না। কঠোর আইনি নিয়মনীতি, স্বাস্থ্য সনদ ও স্থানীয় বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতা সামলে তাঁরা নিজেদের স্বকীয়তা প্রমাণ করেছেন। ভাষা ও সংস্কৃতির সামাজিক দেয়াল পেরিয়ে তাঁরা এখন জায়গা করে নিচ্ছেন মূলধারার চেম্বার অব কমার্স ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ফোরামগুলোতে।
খাদ্যপণ্য ও বুটিকের গণ্ডিতেই কিন্তু তাঁদের এই সাফল্য আটকে থাকেনি। যুক্তরাজ্য ও উত্তর আমেরিকার বাজারে আইটি কনসালটেন্সি, ডিজিটাল মার্কেটিং, অ্যাকাউন্টিং ফার্ম এবং রিয়েল এস্টেট খাতে বাংলাদেশি নারীদের উদ্ভাবনী নেতৃত্ব এখন চোখে পড়ার মতো। মেধাভিত্তিক এসব পেশায় তাঁদের প্রতিষ্ঠানগুলো বহুজাতিক করপোরেট ক্লায়েন্টদের পূর্ণ আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি ও আধুনিক ই-কমার্সের প্রসারের ফলে অনেক প্রবাসী নারী উদ্যোক্তা এখন বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশ থেকে জামদানি, পাটজাত পরিবেশবান্ধব গৃহসজ্জা সামগ্রী ও হাতে তৈরি পণ্য আমদানি করে তাঁরা বিদেশের বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে সরবরাহ করছেন। এর ফলে একদিকে যেমন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের বৈশ্বিক বাজার তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের গ্রামীণ প্রান্তিক কারিগররা পাচ্ছেন ন্যায্য মূল্য।
প্রবাসী নারীদের এই ব্যবসায়িক জাগরণ সরাসরি সুফল বয়ে আনছে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিতে। উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁদের অর্জিত মুনাফার একটি বড় অংশ প্রতি মাসে নিয়মিত ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আসছে। সাধারণ শ্রমজীবী আয়ের তুলনায় উদ্যোক্তাদের পাঠানো এই পুঁজি দেশের অবকাঠামো, ব্যাংক আমানত ও উৎপাদনশীল খাতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
তাঁদের এই বাণিজ্যিক উদ্যোগ দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও বড় অনুঘটক হয়ে উঠছে। ব্যাক-অফিস অপারেশন, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ডিজিটাল গ্রাহকসেবার মতো আউটসোর্সিং কাজগুলো তাঁরা সরাসরি বাংলাদেশের তরুণ ফ্রিল্যান্সারদের দিয়ে করাচ্ছেন। এতে কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি দেশীয় মেধার আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন নিশ্চিত হচ্ছে।











