ভূরাজনৈতিক সংঘাতের মুখে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমবাজার; বিকল্প আছে কি?

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বহুমুখী সংঘাতের মুখে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমবাজার এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতের মতো প্রধান গন্তব্যগুলোতে নতুন ভিসা ইস্যু ও কাজের সুযোগ আশঙ্কাজনক হারে সংকুচিত হচ্ছে। নিরাপত্তা সংকট, ফ্লাইট বিপর্যয় এবং অর্থনৈতিক অচলাবস্থার জেরে ইতোমধ্যে হাজার হাজার প্রবাসী কর্মী দেশে এসে আটকা পড়েছেন, যাদের কর্মস্থলে ফেরার পথ ক্রমেই রুদ্ধ হয়ে আসছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা সংকট এখন আর কেবল সীমান্ত কিংবা সামরিক ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ নেই। সৌদি আরবের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন প্রকল্পে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আতঙ্কে বহু বহুজাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ সীমিত করেছে। ফলে নির্মাণ, লজিস্টিকস ও পরিচ্ছন্নতাসহ বিভিন্ন খাতে নতুন বিদেশি জনবল নেওয়ার চাহিদা হঠাৎ মুখ থুবড়ে পড়েছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে এই মন্দার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। চলতি প্রান্তিকে দেশটিতে কর্মী যাওয়ার ছাড়পত্র আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। কাতার ও কুয়েতের বাজারেও একই সতর্ক অবস্থান দেখা যাচ্ছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কায় নতুন ভিসা ছাড়পত্র আটকে রেখেছে বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
ছুটিতে এসে নিজ দেশে আটকে পড়া প্রবাসীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা সতর্কতা ও দফায় দফায় ফ্লাইট স্থগিতের সরাসরি খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ কর্মীদের। অনেকের রিটার্ন টিকিটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, আবার অনেকের ইকামার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার উপক্রম।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও জনশক্তি রপ্তানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, কেবল সৌদি আরব ও কাতার থেকেই ছুটিতে এসে আটকা পড়া কর্মীর সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সময়মতো ছুটির অনুমোদন বা কাজের চুক্তি নবায়ন না করলে এই কর্মীদের বড় অংশই চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। চড়া সুদে ঋণ ও ধারদেনা করে বিদেশ যাওয়া এসব শ্রমিকের ওপর ভর করে চলা গ্রামীণ পরিবারগুলো এখন মারাত্মক অর্থসংকটে পড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা যে আমাদের অভিবাসন অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, বর্তমান আঞ্চলিক অস্থিরতা তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকের বেশি আসে এই উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। একক অঞ্চলের ওপর দীর্ঘদিনের এই ভরসা নীতিগত ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করছে। মধ্যপ্রাচ্যের দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে আটকে পড়া শ্রমিকদের ভিসা ও ইকামার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে লিয়াজোঁ রক্ষা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া ও পোল্যান্ডের মতো পূর্ব ইউরোপের দেশে এবং জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাজারে কর্মী পাঠানোর বিকল্প রুট তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিকল্প বাজারে প্রবেশ করা সহজসাধ্য নয়। ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার শ্রমবাজারে প্রয়োজন নির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা, ভাষা জ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক মানের পেশাগত সনদ। মধ্যপ্রাচ্যে এতদিন অদক্ষ বা আধা-দক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে যে সুবিধা পাওয়া গেছে, নতুন বাজারে তা খাটবে না। তাই দেশীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে কারিগরি রূপান্তর না আনলে একক বাজার হারানোর ক্ষতি সহজে পূরণ করা সম্ভব হবে না।











