প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনার আইনি অধিকারের অন্তরালে ভোগান্তি ও করুণ বাস্তবতা

বিদেশে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনা প্রতিটি পরিবারের একটি মৌলিক আইনি অধিকার হলেও বাস্তব চিত্র অত্যন্ত নির্মম ও বেদনাদায়ক। প্রতিদিন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একের পর এক কফিনবন্দি হয়ে ফিরছেন স্বপ্নবাজ অভিবাসী শ্রমিকেরা। কাঠফাটা রোদে অমানবিক পরিশ্রমে নিঃশেষিত এসব মানুষের কফিনে ঢালাওভাবে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ লিখে ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে স্বজনদের।
বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেট সংলগ্ন প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখের জল যেন শুকিয়ে গেছে। প্রতিদিন ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিভিন্ন ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড থেকে নেমে আসে একের পর এক কাঠের বাক্স। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে যারা জীবনের সবটুকু বিলিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁদের এই নিঃশব্দ ঘরে ফেরা কোনো সাধারণ বিয়োগান্তক নাটক নয়।
সরকারি নথি বলছে, প্রতি বছর গড়ে সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার শ্রমিকের কফিন আসে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে। এর একটি বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো থেকে। কিন্তু কফিন হস্তান্তরের পর স্বজনদের কাঁধে চেপে বসে এক গভীর অন্ধকার শূন্যতা।
বিশ থেকে চল্লিশ বছর বয়সী সুস্থ-সবল যুবকেরা বিদেশে গিয়ে আকস্মিকভাবে হৃদরোগে মারা যাচ্ছেন; এই ব্যাখ্যা কোনোভাবেই যৌক্তিক ঠেকছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তীব্র দাবদাহে একটানা ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ, অনিরাপদ বাসস্থান এবং চরম মানসিক উদ্বেগের কারণে তাঁদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে পড়ে।
বিদেশের হাসপাতালগুলোতে কোনো পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্ত ছাড়াই ডেথ সার্টিফিকেটে দায়সারাভাবে ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ বা ‘ন্যাচারাল ডেথ’ লিখে দেওয়া হয়। এই সংক্ষিপ্ত একটি শব্দের কারণে বিদেশি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান যেকোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ বা জীবনবীমার দায় থেকে আইনিভাবে মুক্তি পেয়ে যায়। ফলে নিঃস্ব পরিবারগুলো হারায় আর্থিক সুরক্ষার শেষ সম্বলটুকু।
আইন অনুযায়ী প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যুর পর কর্মস্থলের মালিকপক্ষ অথবা নিয়োগকারী সংস্থার খরচে কফিন দেশে পাঠানোর কথা। তবে কোম্পানি দায়িত্ব এড়িয়ে গেলে কিংবা কর্মী অনিয়মিত থাকলে সরকারি অর্থায়নে প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সুস্পষ্ট দায়িত্ব।
বাস্তব ক্ষেত্রে এই অধিকারটুকু পেতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছোটাছুটি করতে হয়। দূতাবাসের অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনা সংক্রান্ত আইনি অনুমোদন পেতে মাসের পর মাস সময় পেরিয়ে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রবাসের মর্গে অনেক কর্মীর লাশ বরফবন্দি হয়ে পড়ে থাকে।
বিমানবন্দরে লাশ হস্তান্তরের সময় প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে দাফন ও পরিবহনের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ৩৫ হাজার টাকার একটি চেক দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী ধাপে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের বরাদ্দকৃত ৩ লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা পাওয়ার পথটি মোটেই সহজ নয়।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সনদ, উত্তরাধিকার প্রত্যয়নপত্র, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা ও জেলা জনশক্তি অফিসের যাচাই-বাছাইয়ের মতো বহুবিধ ধাপ পেরোতে হয়। যেসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ পরিবার সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়, তাদের দিনের পর দিন বিভিন্ন দপ্তরে জুতো ক্ষয় করতে হয়। প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনা থেকে শুরু করে ক্ষতিপূরণ লাভ—প্রতিটি স্তরেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের তীব্র অভাব।











