মধ্যপ্রাচ্যে লাখ লাখ টাকা খুইয়ে কেন অবৈধ হচ্ছেন প্রবাসীরা?

মধ্যপ্রাচ্যে তথাকথিত ফ্রি ভিসা নিয়ে কাজ করার প্রলোভনে পড়ে প্রতি বছর সর্বস্বান্ত হচ্ছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী। নিজের ইচ্ছেমতো যেকোনো সংস্থায় কাজ ও বেশি আয়ের লোভ দেখিয়ে গ্রামগঞ্জের নিরীহ যুবকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে এই অননুমোদিত ভিসা। বাস্তবে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর দেখা যায় কোনো নির্দিষ্ট কফিল বা বৈধ কর্মসংস্থান নেই; ফলে কয়েক মাসের ব্যবধানেই তারা সেখানে সম্পূর্ণ অবৈধ হয়ে পড়েন।
সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রচলিত শ্রম আইনে ‘ফ্রি ভিসা’ বলে কোনো বৈধ পরিভাষা নেই। মূলত স্থানীয় কিছু অসাধু নাগরিক বা কফিল নিজেদের বাণিজ্যিক লাইসেন্সের বিপরীতে অতিরিক্ত শ্রমিকের অনুমোদন বের করে দালালদের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করে দেয়। দালাল চক্র গ্রামে গ্রামে প্রচার চালায় যে এই ভিসায় গেলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনভাবে চাকরি করা যাবে, যা স্থানীয় আইনে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।
বাংলাদেশ থেকে একজন শ্রমিক যখন চার থেকে সাত লাখ টাকা ধারদেনা করে মধ্যপ্রাচ্যে পা রাখেন, তখন তিনি জানতেও পারেন না যে তার কোনো নির্দিষ্ট কর্মসংস্থান নেই। মধ্যস্বত্বভোগী চক্রটি বিমানবন্দর পার করে দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করে প্রবাসীদের রাস্তায় নামিয়ে দেয়। ফলে ভাগ্য বদলাতে গিয়ে প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় বেঁচে থাকার চরম অনিশ্চিত লড়াই।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বৈধভাবে বসবাসের মূল চাবিকাঠি হলো দেশটির রেসিডেন্স পারমিট বা ‘আকামা’। কিন্তু তথাকথিত ফ্রি ভিসায় যাওয়া কর্মীদের আকামা নবায়নের দায়িত্ব কোনো প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে নেয় না। উল্টো প্রতি বছর আকামা নবায়নের জন্য কফিলকে মোটা অঙ্কের অন্যায্য ফি দিতে হয়, যা সাধারণ একজন দিনমজুর বা নির্মাণ শ্রমিকের পক্ষে জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
টাকা দিতে না পারলে বা কফিলের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তা দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়ে কর্মীকে পলাতক বা ‘হুরুব’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে দেয়। একবার এই হুরুব তালিকায় নাম উঠলে কর্মী আইনগতভাবে সম্পূর্ণ সুরক্ষাহীন হয়ে পড়েন এবং তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে সব নাগরিক সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। এমতাবস্থায় বৈধ হওয়ার সব আইনি পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে রিয়াদের বাথা, সানাইয়া কিংবা দুবাইয়ের দেইরা ও সোনাপুরের মতো প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নিয়মিত যৌথ সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রতিদিন ভোরে কাজের সন্ধানে চত্বরগুলোতে জড়ো হওয়া শ্রমিকদের মধ্য থেকে আটক করা হচ্ছে শত শত অননুমোদিত বাংলাদেশিকে। পুলিশের গাড়ি দেখলেই গলির ভেতর পালিয়ে যাওয়া কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থাকাই এখন বহু শ্রমিকের নিত্যদিনের নিয়তি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে সরাসরি পাঠিয়ে দেওয়া হয় তারহিল বা ডিপোর্টেশন সেন্টারে, যেখান থেকে খালি হাতে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরতে হয়। দেশে রেখে আসা ঋণের বোঝা, পরিবারের হতাশা আর বিদেশের বন্দিশালার দুঃসহ স্মৃতি—এই তিনের চাপে বহু প্রবাসী মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ছেন। স্বাধীনভাবে কাজ করে বাড়তি রোজগারের মোহ তাদের ঠেলে দিচ্ছে এক অন্তহীন বিপদের মুখে।
ভুক্তভোগী প্রবাসীদের দায়ের করা বিভিন্ন অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতারিত হলেও তাদের আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। কারণ হিসেবে অভিবাসন বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, দালালরা তাদের হাতে এমন কোনো নিয়োগপত্র বা সুনির্দিষ্ট চুক্তিপত্র দেয় না যা দিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম আদালতে প্রতারণা প্রমাণ করা সম্ভব। উপরন্তু নিবন্ধিত স্পনসর ছাড়া বাইরে কাজ করায় স্থানীয় শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মীরাই উল্টো শাস্তিযোগ্য অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হন।
অভিবাসন খাতের নীতি নির্ধারকরা স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিচ্ছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমাতে হলে অবশ্যই সরকারিভাবে বিএমইটি ছাড়পত্র এবং সুনির্দিষ্ট নিয়োগকর্তার বৈধ ভিসা যাচাই করে যেতে হবে। কোনো দালাল বা এজেন্সির মৌখিক আশ্বাসে কান দিয়ে তথাকথিত ফ্রি ভিসার ফাঁদে পা দিলে জীবনের সমস্ত সঞ্চয় হারানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও নির্বাসনের মুখে পড়তে হবে। তাই দেশ ছাড়ার আগেই কাগজপত্র যাচাই করে সচেতন হওয়া প্রবাসীদের একমাত্র কার্যকর সুরক্ষা কবচ।











