নভেম্বর ৯, ২০২৬
#নতুন প্রবাসী গাইড

ইএসডিপি চুক্তি সই: জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু ২০২৭ সালের এপ্রিলে

জাপানে বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে ঢাকা ও টোকিওর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে ঐতিহাসিক ‘এমপ্লয়মেন্ট স্কিলস ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন’ (ইএসডিপি-এমওসি) চুক্তি। এই কাঠামোর মধ্য দিয়ে পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপানের শ্রমবাজারে দেশের দক্ষ তরুণদের কাজ করার দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে এই কর্মী নিয়োগ কার্যক্রম। আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের এই নতুন সুযোগকে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক আয়ের ক্ষেত্রে এক বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন নীতিনির্ধারকেরা।

জাপানের ক্রমহ্রাসমান তরুণ জনগোষ্ঠীর কারণে দেশটির উৎপাদন ও সেবামূলক খাতে দীর্ঘমেয়াদি জনবল ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় জাপান সরকার বন্ধুপ্রতিম উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে সনদপ্রাপ্ত দক্ষ কর্মী নেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে টোকিও।

টোকিওতে অনুষ্ঠিত এই চুক্তিতে বাংলাদেশের পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব স্বাক্ষর করেন। জাপানের পক্ষে যৌথভাবে স্বাক্ষর করেছে দেশটির বিচার মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল পুলিশ এজেন্সি। দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে সরাসরি সমন্বয়ের ফলে কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটের প্রভাব ছাড়াই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মী বাছাই সম্ভব হবে।

স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় মূলত চারটি প্রধান কর্মখাতে বাংলাদেশি কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে কেয়ারগিভার বা প্রবীণ ও অসুস্থদের স্বাস্থ্যসেবা, আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক অবকাঠামো নির্মাণ, বাণিজ্যিক কৃষি এবং ভারী ও হালকা যন্ত্রাংশ উৎপাদন শিল্প। প্রতিটি খাতেই জাপানি প্রযুক্তি ও কাজের পরিবেশের উপযোগী দক্ষ কর্মীর বিশাল চাহিদা রয়েছে।

জাপানের কর্মপরিবেশে মানিয়ে নিতে প্রার্থীদের নির্দিষ্ট ট্রেডের কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি জাপানি ভাষা শিক্ষাকে অন্যতম প্রধান শর্ত করা হয়েছে। প্রার্থীদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ড অনুযায়ী জাপানি ভাষার নির্দিষ্ট গ্রেড পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। সরকার নির্ধারিত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে জাপানের চাহিদা অনুযায়ী বিশেষ প্রশিক্ষণ মডিউল চালুর প্রস্তুতিও ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

নতুন এই চুক্তির বড় শক্তি হলো জাপানে বাংলাদেশি কর্মী হিসেবে যোগদানকারী প্রত্যেকে দেশটির নিজস্ব শ্রমিকদের সমান আইনি মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। ন্যূনতম মজুরির ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য থাকবে না এবং অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পদোন্নতি ও উচ্চ বেতনের পথ উন্মুক্ত থাকবে। নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, চিকিৎসা সুবিধা এবং স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করতে জাপান সরকার কঠোর আইনি তদারকি রাখবে।

নারী কর্মীদের জন্য কর্মপরিবেশ নিরাপদ রাখতে রাখা হয়েছে বিশেষ সুরক্ষামূলক ধারা। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, মাতৃত্বকালীন ছুটি, গর্ভধারণ কিংবা সন্তান প্রসবজনিত কারণে কোনো নারী কর্মীকে চাকরিচ্যুত বা বেতন কাটা যাবে না। একই সঙ্গে কোনো কর্মীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানোর বিধান পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে।

দ্বিপক্ষীয় এই চুক্তির প্রাথমিক মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ বছর। তবে এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও পাঁচ বছর মেয়াদ বৃদ্ধির বিশেষ ধারা যুক্ত থাকায় এর কার্যকর সময়সীমা দাঁড়াবে মোট ১০ বছর। দীর্ঘমেয়াদি এই নিশ্চয়তা বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি খাতে কৌশলগত স্থিতিশীলতা বয়ে আনবে।

ঐতিহ্যগত অদক্ষ শ্রমবাজারের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে উন্নত অর্থনীতির দেশে প্রবেশ বাংলাদেশের জন্য এক যুগান্তকারী অর্জন। জাপানে কর্মরত দক্ষ শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতকে আরও মজবুত করবে। এছাড়া আধুনিক শিল্প সংস্কৃতি ও সময় সচেতনতার শিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে আসা কর্মীরা পরবর্তীতে দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প বিকাশেও নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখতে পারবেন।

ইএসডিপি চুক্তি সই: জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু ২০২৭ সালের এপ্রিলে

মধ্যপ্রাচ্যে লাখ লাখ টাকা খুইয়ে কেন অবৈধ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *