ফ্রান্সে বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক লুটপাট ও হামলা; চরম উৎকণ্ঠায় প্রবাসীরা

ফ্রান্সে বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সহিংস বিক্ষোভের মধ্যে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় প্যারিসসহ দেশটির প্রবাসী উদ্যোক্তাদের মাঝে চরম উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। জীবনযাত্রার অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন এখন ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। নিত্যদিনের দোকানপাট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা লক্ষ্য করে সংঘটিত এই হামলায় প্রবাসী ব্যবসায়ীদের বহু বছরের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে।
গত সপ্তাহের সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে প্যারিসে হাসান নামের এক প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর মোবাইল ফোনের এক্সেসরিজ ও ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকানে নির্বিচারে ভাঙচুর চালানো হয়। বিক্ষোভকারীদের একটি উচ্ছৃঙ্খল দল শাটার ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে নিমিষেই দোকানের মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়।
ভুক্তভোগী এই ব্যবসায়ী জানান, তার প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৯০ হাজার ইউরো বা বাংলাদেশি মুদ্রায় কোটি টাকারও বেশি মূল্যের মালামাল মজুত ছিল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুর্বৃত্তরা পুরো দোকানের শো-কেস ভেঙে সব পণ্য নিয়ে পালিয়ে যায়। দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমে তিল তিল করে গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি।
প্যারিসের মতো ব্যয়বহুল শহরে এমন বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যে কোনো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। বিমা দাবির জটিলতা এবং প্রশাসনিক সহায়তার দীর্ঘসূত্রতা হাসানসহ অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের হতাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয়ের কারণে সাধারণ ফরাসি নাগরিকদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়ন ও সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। শান্তিপূর্ণভাবে দাবি আদায়ের কথা থাকলেও বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে কিছু অপরাধী চক্র সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষ করে প্যারিসের প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক সড়ক ও অভিবাসীবহুল এলাকার দোকানপাটগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। বিলাসবহুল শোরুম থেকে শুরু করে সাধারণ ইলেকট্রনিক্স ও নিত্যপণ্যের দোকান; কোনো কিছুই এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে মারাত্মকভাবে স্থবির করে ফেলেছে।
চলমান অস্থিরতার কারণে ফ্রান্সে বাংলাদেশি ব্যবসা পরিচালনার স্বাভাবিক পরিবেশ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে বললেই চলে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে যেখানে বেচাকেনা সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা, সেখানে এখন দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বন্ধ দোকানের সামনেও পাহারা বসিয়ে কিংবা শাটার শক্ত করে আটকে রাখার মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে তাদের।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, ফ্রান্সে বাংলাদেশি ব্যবসা মূলত কঠোর পরিশ্রম ও সীমিত পুঁজির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো ধরনের নিরাপত্তা বলয় ছাড়া এভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা এখন জীবন ও জীবিকা দুটোকেই বাজি রাখার শামিল। অনেক ব্যবসায়ীই জানিয়েছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা নতুন কোনো মালামাল দোকানে ওঠাতে সাহস পাচ্ছেন না।
পরিস্থিতির চরম অবনতি দেখে শনিবার ফ্রান্সজুড়ে বড় ধরনের নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রাজধানী প্যারিসসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও আধা-সামরিক জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের নৈরাজ্য ঠেকাতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা সরঞ্জাম।
ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও প্রবাসীদের মনের আতঙ্ক পুরোপুরি কাটছে না। বিশেষ করে আগের দিনগুলোতে পুলিশের উপস্থিতির মধ্যেই যেভাবে দ্রুত হামলা ও লুটপাট চালানো হয়েছে, তাতে নতুন সহিংসতার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এই বাড়তি নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখনও উৎকণ্ঠায় রয়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।











