নভেম্বর ৯, ২০২৬
#জাতীয় #শীর্ষ-২

প্রবাসী কার্ড: বিমানবন্দরে অগ্রাধিকার ও চিকিৎসায় ছাড়সহ মিলবে ১০ সুবিধা

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিক ও অভিবাসনপ্রত্যাশী কর্মীদের সার্বিক সুরক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ নিশ্চিত করতে বহুল প্রতীক্ষিত প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশের অর্থনীতি সচল রাখার মূল কারিগর রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করাই এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য। প্রাথমিক পর্যায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের ডুয়াল কারেন্সি ডেবিট কার্ড আকারে এটি প্রবাসীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।

বিদেশে ঘাম ঝরানো কর্মীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করা এবং তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে দীর্ঘদিন ধরেই একটি সমন্বিত কার্ডের দাবি ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১৮ জুলাই সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে এই কার্ড চালুর রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়।

বৈঠকের সিদ্ধান্তের সূত্র ধরে একই বছরের ১০ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জনতা ব্যাংক পিএলসির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রবাসীদের জন্য আধুনিক ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার একটি বড় দুয়ার উন্মোচিত হলো।

ঘোষিত পরিকল্পনা অনুসারে, এই কার্ডধারী প্রবাসীরা দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশে অন্তত ১০ ধরনের সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় ও বাণিজ্যিক সুবিধা উপভোগ করবেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিমানবন্দর কেন্দ্রিক অগ্রাধিকার সেবা। কার্ডধারীরা দেশ-বিদেশের বিমানবন্দরে বিশেষ লাউঞ্জ ব্যবহারের পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে ডেডিকেটেড বুথ ও ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ সহায়তা পাবেন।

ভ্রমণ সুবিধার অংশ হিসেবে বিমান টিকিট এবং দেশি-বিদেশি হোটেল বুকিংয়ে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি হাসপাতালে প্রবাসীদের জন্য আলাদা সেবা ডেস্ক স্থাপন করা হবে এবং নির্ধারিত বেসরকারি হাসপাতালে মিলবে চিকিৎসা খরচে ছাড়। এছাড়া বিদেশে কোনো কর্মীর আকস্মিক মৃত্যু ঘটলে সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার মতো সংবেদনশীল মানবিক সুরক্ষাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আর্থিক খাতে বড় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে রেমিট্যান্স রিওয়ার্ড পয়েন্ট, প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেডিট স্কোরিং এবং সহজ শর্তে পুনর্বাসন ঋণ। এর পাশাপাশি জমি নিবন্ধন, নামজারি, ইউটিলিটি সংযোগ, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং দ্রুত কনস্যুলার সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রবাসী কার্ডধারীরা অগ্রাধিকার পাবেন।

কার্ডটির ঘোষণা আসার পর থেকেই প্রবাসীদের মাঝে এটি পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, বৈধভাবে বিদেশে কর্মরত প্রবাসী এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে নতুন কর্মসংস্থানে যেতে প্রস্তুত কর্মীরা এই কার্ডের প্রাথমিক দাবিদার।

তবে সাধারণ প্রবাসীদের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া কবে থেকে উন্মুক্ত হবে এবং কার্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে কোনো ফি নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত নীতিমালা চূড়ান্ত করছে মন্ত্রণালয়। পাইলট প্রকল্পের আওতায় প্রথম দফায় নির্দিষ্ট সংখ্যক কার্ড বিতরণের পর দ্রুততম সময়ে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলের ঝুঁকি এড়িয়ে প্রবাসীদের বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সম্পৃক্ত করতে এই কার্ড একটি বড় মাধ্যম হবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। ডুয়াল কারেন্সি সুবিধা থাকায় কার্ডধারীরা প্রবাসে উপার্জিত অর্থ নিজের কার্ডে সংরক্ষণ করতে পারবেন এবং দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের জন্যও সহজে খরচের জোগান দিতে পারবেন।

বিমানবন্দরের অযাচিত ভোগান্তি দূর করা থেকে শুরু করে প্রবাসফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনে এই সেবা বড় সহায়ক হতে যাচ্ছে। ফলে প্রবাসী কার্ড কেবল একটি সাধারণ ব্যাংকিং কার্ড নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি বাংলাদেশির আত্মমর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রতীকে রূপ নিচ্ছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *