ফ্রান্সে অনথিভুক্তদের স্বাস্থ্যসেবা বহালে যুগান্তকারী রায়: স্বস্তিতে প্রবাসী শ্রমিকরা

ফ্রান্সে অনথিভুক্তদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ‘এদ মেদিকাল দে লেতা’ (আমে) বহাল রাখার পক্ষে চূড়ান্ত রায় দিয়েছে দেশটির সাংবিধানিক কাউন্সিল। ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সুবিধা বাতিলের তীব্র দাবির মুখে এই আইনি সুরক্ষা বহাল থাকায় দেশটিতে বসবাসরত কয়েক লাখ অনিয়মিত অভিবাসী বড় ধরনের অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা পেলেন। চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীদের ধারাবাহিক প্রতিবাদের মুখে সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালত জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই মানবিক কর্মসূচি অক্ষুণ্ন রাখার নির্দেশ দেয়।
ফ্রান্সের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ২০০০ সাল থেকে কার্যকর রয়েছে রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা সহায়তা কর্মসূচি ‘এদ মেদিকাল দে লেতা’ (AME)। ফ্রান্সে অন্তত তিন মাস ধরে বসবাসকারী অনথিভুক্ত অভিবাসীদের জরুরি চিকিৎসা, প্রসূতি সেবা ও সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসার খরচ বহন করে এই তহবিল। সম্প্রতি অভিবাসন আইন কঠোর করার প্রক্রিয়ায় ফরাসি সিনেটের রক্ষণশীল দলগুলো এই সেবাকে সীমিত করে কেবল ‘জরুরি জীবনরক্ষাকারী সেবা’ বা এএমইউ-তে নামিয়ে আনার প্রস্তাব তোলে।
ডানপন্থি আইনপ্রণেতাদের দাবি ছিল, এই সেবার কারণে ফ্রান্সে অনথিভুক্তদের আগমন বাড়ছে এবং রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। তবে ফরাসি স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় সংস্থা এবং সাংবিধানিক পর্যবেক্ষকরা সুস্পষ্টভাবে জানান, মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশেরও কম খরচ হয় এই খাতে। ফলে আদালতের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সে অনথিভুক্তদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার আইনি পথ আরও একবার সুরক্ষিত হলো।
বিতর্কিত এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সোচ্চার ছিলেন ফ্রান্সের শীর্ষ চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সমাজকর্মীরা। প্রায় তিন হাজারের বেশি ফ্রন্টলাইন চিকিৎসক এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, রোগীদের কাগজপত্র দেখে চিকিৎসা বন্ধ করা চিকিৎসা বিজ্ঞানের নৈতিকতা পরিপন্থি। রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত না হলে তা মহামারির মতো স্থানীয় সমাজে ছড়িয়ে পড়ার বাস্তব ঝুঁকি থাকে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখায় এবং আইনি যুক্তিতর্কে প্রমাণ করে যে প্রাথমিক যত্ন আটকে দিলে পরবর্তীতে রোগীরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে ভিড় করবেন। এতে চিকিৎসার সামগ্রিক ব্যয় কমার বদলে উল্টো বহুগুণ বেড়ে যাবে। বিশেষজ্ঞদের এই তথ্যভিত্তিক ও মানবিক যুক্তির কারণেই সাংবিধানিক কাউন্সিল কট্টরপন্থিদের চাপ অগ্রাহ্য করে সিদ্ধান্ত পুনর্বহাল রাখে।
প্যারিসের ইলে-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলসহ শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণকাজ, রেস্তোরাঁ ও খাদ্য সরবরাহ খাতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি অভিবাসী কাজ করেন। যাদের অনেকেরই এখনও স্থায়ী বসবাসের বৈধ কাগজপত্র মেলেনি, তারা তীব্র শীত কিংবা কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হলে চিকিৎসার একমাত্র উপায় এই এএমই কার্ড।
আদালতের রায় ঘোষণার পর স্থানীয় প্রবাসী সংগঠন ও শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক স্বস্তি নেমে আসে। প্যারিসের অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা জানান, এই কার্ড ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। তাদের মতে, ফ্রান্সে অনথিভুক্তদের স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা বা অতিরিক্ত সুবিধা নয়, বরং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার এবং কাজ করে জীবিকা নির্বাহের ন্যূনতম ভরসা।











