নভেম্বর ৯, ২০২৬
#মধ্যপ্রাচ্য

কাতারে বেতন সুরক্ষা ব্যবস্থা অমান্য করলেই ভিসা স্থগিত: স্বস্তিতে প্রবাসী শ্রমিকরা

কাতারে বেতন সুরক্ষা ব্যবস্থা শতভাগ বাস্তবায়নে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ওপর নজরদারি অভূতপূর্ব মাত্রায় জোরদার করেছে দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়। দীর্ঘদিন ধরে বেতন বকেয়া থাকার যে অনিশ্চয়তায় প্রবাসী শ্রমিকরা ভুগতেন, তা নিরসনে সরকারের এই কঠোর অবস্থান বড় পরিবর্তন আনছে। নতুন নিয়মে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মীদের ব্যাংক বা অনুমোদিত ডিজিটাল ওয়ালেটে পারিশ্রমিক হস্তান্তর না করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নতুন কাজের ভিসা ও প্রশাসনিক ছাড়পত্র।

উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে শ্রম অধিকার সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে গত কয়েক বছর ধরে বড় ধরনের আইনি সংস্কার চালিয়ে আসছে কাতার। সেই ধারাবাহিকতায় ‘ওয়েজ প্রোটেকশন সিস্টেম’ বা ডব্লিউপিএস কার্যকরে বাড়তি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আগে নিয়ম থাকলেও বহু প্রতিষ্ঠান নানা অছিলায় কর্মীদের পাওনা আটকে রাখত।

মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেবল বেতন দেওয়াই যথেষ্ট নয়, তা হতে হবে মাসের প্রথম সপ্তাহের নির্ধারিত ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের তথ্যভাণ্ডার সংযুক্ত থাকায় এখন আর কোনো প্রতিষ্ঠান বেতন পরিশোধ নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে ফাঁকফোকর গলে বেতন আটকে রাখার পুরনো কৌশল পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে।

নতুন বিধিমালার আওতায় প্রতি মাসের ১ তারিখে বেতন নির্ধারিত হলে পরবর্তী সাত দিনের মধ্যেই ইলেকট্রনিক স্যালারি ফাইল (SIF) ব্যাংকে জমা দিয়ে অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর নিশ্চিত করতে হবে। যদি ৭ তারিখের মধ্যে কর্মীদের অ্যাকাউন্টে বেতনের টাকা জমা না পড়ে, তবে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাতার ভিসা সেন্টারের কার্যক্রম ও নতুন ওয়ার্ক পারমিট ইস্যু বন্ধ করে দেয়।

কোনো ধরনের সরকারি নোটিশ বা শুনানির অপেক্ষা না রেখেই কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে। ফলে বিদেশি কর্মী এনে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে চাওয়া কোম্পানিগুলো নিজেদের স্বার্থেই এখন নির্ধারিত তারিখের আগেই বেতন ছাড়পত্র প্রস্তুত রাখছে। বেতন পরিশোধ নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ওই কোম্পানির অনুকূলে কোনো প্রকার ভিসা ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না।

কাতারপ্রবাসী বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী সাধারণত নির্মাণ, ক্লিনিং, আতিথেয়তা ও রিটেইল খাতে কর্মরত। অতীতে বিভিন্ন সাব-কন্ট্রাক্টিং ও মাঝারি মানের কোম্পানিতে কাজ করা প্রবাসীরা প্রায়ই অভিযোগ করতেন, দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত তাদের পাওনা বকেয়া রাখা হতো। এতে দেশে পরিবারের কাছে টাকা পাঠানো যেমন বন্ধ হয়ে যেত, তেমনি প্রবাসে দৈনন্দিন খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ত। এখন ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে মোবাইলেই বেতনের বার্তা চলে আসায় মধ্যস্বত্বভোগী বা কোম্পানির বিলম্বের সুযোগ বন্ধ হয়েছে। সময়মতো অর্থ হাতে পাওয়ায় রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবাহ যেমন স্বাভাবিক থাকছে, তেমনি মানসিকভাবেও স্বস্তিতে আছেন কর্মীরা। নিয়ম অমান্যকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে সরাসরি শ্রম আদালতে যাওয়ার পথও এখন আরও সুগম।

শ্রম আইন অনুযায়ী, কাতারে বেতন সুরক্ষা ব্যবস্থা ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘনকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কেবল ভিসা স্থগিত করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না প্রশাসন। প্রতিটি অনিয়মের বিপরীতে কর্মীপ্রতি নির্ধারিত অঙ্কের জরিমানা ধার্য করা হচ্ছে, যা বারবার ঘটলে বহুগুণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির পরিচালকদের ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য বাণিজ্যিক লাইসেন্স নবায়নে জটিলতা তৈরির মতো কড়া পদক্ষেপ রাখা হয়েছে।

দোহায় অবস্থানরত শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেল-গ্যাসভিত্তিক অর্থনীতির বাইরে গিয়ে আধুনিক শ্রমবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ। ফলে কাতারে কাজ করতে যাওয়া যে কোনো বিদেশি কর্মীর জন্য তাদের উপার্জিত অর্থের নিরাপত্তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চিত।

কাতারে বেতন সুরক্ষা ব্যবস্থা অমান্য করলেই ভিসা স্থগিত: স্বস্তিতে প্রবাসী শ্রমিকরা

এক সপ্তাহে ১৪ হাজার প্রবাসীকে আটক করেছে

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *