নভেম্বর ৯, ২০২৬
#আমেরিকা

স্টেথোস্কোপ ছেড়ে ককপিট: একটি ভিডিও যেভাবে বদলে দিল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এভার জীবন

সাদা অ্যাপ্রন গায়ে জড়িয়ে স্টেথোস্কোপ হাতে রোগীদের সেবা করবেন এমনটাই ছিল এভা ছোয়ার শৈশবের স্বপ্ন। বাংলাদেশি বাবা-মায়ের এই সন্তানের চোখে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন বুনে দিয়েছিল পরিবারও। কিন্তু দশ বছর বয়সের এক পড়ন্ত বিকেলে ইউটিউবের একটি নাটকীয় ভিডিও এভার জীবনের গতিপথ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিল।

এভা যখন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী, তখন কৌতূহলবশত ইউটিউব স্ক্রল করতে করতে তার চোখে পড়ে ২০০৯ সালের সেই বিখ্যাত বিমান দুর্ঘটনার ভিডিও। সেটি ছিল ইউএস এয়ারওয়েজ ফ্লাইট-১৫৪৯-এর জরুরি অবতরণের দৃশ্য। দুই ইঞ্জিনে পাখি ঢুকে বিকল হয়ে যাওয়ার পর অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে বিমানটিকে নিউ ইয়র্কের হাডসন নদীতে নামিয়ে এনেছিলেন পাইলট চেলসি সালেনবার্গার।

৪৫ মিনিটের সেই ভিডিওটি ছিল টান টান উত্তেজনা আর রোমাঞ্চে ঠাসা। একটি যান্ত্রিক দানবকে কীভাবে মানুষের বুদ্ধিমত্তা আর সাহসিকতা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা দেখে ১০ বছর বয়সী এভা আক্ষরিক অর্থেই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ে। যে বয়সে রূপকথার গল্পে বুঁদ থাকার কথা, সেই বয়সে এভা খুঁজে পায় জীবনের নতুন এক দর্শন। চিকিৎসার জগতের শান্ত শীতল করিডরের চেয়ে মেঘের রাজ্যের চ্যালেঞ্জ তাকে বেশি টানতে শুরু করে।

আরও পড়ুনঃ লাতিন আমেরিকার হাতছানি: দক্ষিণ আমেরিকায় বাংলাদেশিদের নতুন শ্রমবাজার

এভার ছোটবেলা কেটেছে মেডিকেল স্টেম (STEM) কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকে। অ্যানাটমি, রোগতত্ত্ব আর মানুষের শরীর নিয়ে নানা কৌতূহল তাকে সব সময় তাড়া করে বেড়াত। আত্মীয়-স্বজনদের কাছে ‘ভবিষ্যতের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এভা যখন হঠাৎ করে পাইলট হওয়ার ইচ্ছার কথা জানালেন, তখন পরিবার শুরুতে কিছুটা অবাক হয়েছিল।

তবে এভার জেদ আর এভিয়েশন বা বিমান চালনা বিদ্যার প্রতি তার গভীর আগ্রহ দেখে অভিভাবকরা পিছু হটেননি। এভা বুঝতে পারেন, একজন চিকিৎসক যেমন অপারেশন টেবিলে জীবন বাঁচান, একজন দক্ষ পাইলটও তেমনি শত শত যাত্রীর জীবন রক্ষার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নীল আকাশে ডানা মেলেন। এই জীবন রক্ষার তাড়না থেকেই তার পেশার ধরন বদলে গেলেও মূল লক্ষ্যটা একই থেকে যায়।

এভা ছোয়ার এই গল্পটি আধুনিক সময়ের একটি বড় উদাহরণ। যেখানে আগেকার দিনে অনুপ্রেরণার উৎস ছিল কেবল পাঠ্যবই বা চারপাশের চেনা মানুষ, সেখানে আজকের ডিজিটাল বিশ্বে একটি ইউটিউব ভিডিও একটি শিশুর গোটা ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। এভার জীবনের এই মোড় পরিবর্তন আমাদের শেখায় যে, পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কেবল পারিবারিক ঐতিহ্য নয়, বরং মনের গহীন থেকে আসা ডাকই চূড়ান্ত হওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্টেম বা বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এভার জন্য এই পরিবর্তন সহজ হয়েছে। কারণ চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং বৈমানিক বিদ্যা—উভয় ক্ষেত্রেই প্রবল গাণিতিক দক্ষতা এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োজন হয়।

এভা ছোয়ার স্বপ্ন এখন আর কেবল একটি ভিডিওতে সীমাবদ্ধ নেই; তা এখন বাস্তবতার পথে ধাবমান। জীবনের সব হিসাব নিকাশ যেমন এক রেখায় এগোয় না, তেমনি এভার এই অকাল ‘পাখনা গজানো’ তাকে নিয়ে যাবে এক অন্য উচ্চতায়। সাদা অ্যাপ্রন হয়তো তার গায়ে চড়ানো হবে না, কিন্তু নীল আকাশের ককপিটে বসে যখন তিনি বিমান নিয়ন্ত্রণ করবেন, তখন হাজার ফুট ওপর থেকে তিনি হয়তো সেই ১০ বছরের ছোট্ট এভাকে ধন্যবাদ জানাবেন, যে সেদিন ইউটিউবে ওই একটি ভিডিওতে ক্লিক করার সাহস দেখিয়েছিল।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *