আয়ারল্যান্ডে আইটি ক্যারিয়ার ও টেক জায়ান্টদের ইউরোপীয় হাবে বিশাল সুযোগ

আয়ারল্যান্ডে আইটি ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন এখন যেকোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণের জন্য নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের ভিসা নীতি ও চাকরির বাজারে নানা কঠোরতার মুখে আয়ারল্যান্ড এখন ইউরোপের অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। গুগল, মেটা ও অ্যাপলের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এবং সহজ স্টেই-ব্যাক ভিসার সুবাদে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা মাস্টার্স শেষ করেই সরাসরি বড় কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন।
আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনের গ্র্যান্ড ক্যানেল ডক এলাকাটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘সিলিকন ডকস’ নামে পরিচিত। ইউরোপের নমনীয় কর নীতি এবং দক্ষ ইংরেজিভাষী জনবলের কারণে বিশ্বের সেরা সব প্রযুক্তি জায়ান্ট তাদের ইউরোপীয় কার্যক্রমের মূল কেন্দ্র হিসেবে ডাবলিনকে বেছে নিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা চলাকালীন এবং গ্র্যাজুয়েশনের পর প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কর্পোরেট সংস্কৃতিতে যুক্ত হওয়ার অসামান্য সুযোগ তৈরি হয়।
যুক্তরাজ্য যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক প্রবাসীদের জন্য কাজের ভিসা ও পোস্ট-স্টাডি নিয়মে নানা কড়াকড়ি আরোপ করছে, সেখানে আয়ারল্যান্ড আন্তর্জাতিক মেধাবীদের সাদরে গ্রহণ করছে। এখানকার গতিশীল অর্থনীতি ও দ্রুত বর্ধনশীল টেক ইকোসিস্টেমে প্রতিদিন নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সায়েন্স ও এআই বিশেষজ্ঞদের জন্য আয়ারল্যান্ডের বাজার এখন সবচেয়ে বেশি উদীয়মান।
আয়ারল্যান্ডে উচ্চশিক্ষা শেষে প্রবাসীদের জন্য যে ইমিগ্রেশন সুবিধাটি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ তৈরি করেছে তা হলো তাদের থার্ড লেভেল গ্র্যাজুয়েট স্কিম। এই নিয়মের অধীনে ব্যাচেলর বা অনার্স (NFQ Level 8) সম্পন্নকারীরা ১২ মাস এবং মাস্টার্স বা পিএইচডি (NFQ Level 9/10) সম্পন্নকারীরা টানা ২৪ মাস বা ২ বছরের জন্য ‘স্ট্যাম্প ১জি’ (Stamp 1G) পারমিট পেয়ে থাকেন।
এই ভিসার সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, কোনো কোম্পানির আগাম চাকরির অফার বা স্পন্সরশিপ ছাড়াই এটি সরাসরি পাওয়া যায়। প্রবাসীরা এই ২ বছর সময়কালে যেকোনো প্রযুক্তি সংস্থায় পূর্ণকালীন কাজ করতে পারেন এবং নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করে স্থায়ী স্পন্সরশিপের ব্যবস্থা করতে পারেন। ফলে তরুণ শিক্ষার্থীদের পেশাগত ক্যারিয়ার শুরুর এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বাড়তি কোনো প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হয় না।
যেসব বিদেশি পেশাজীবী আইটি ও ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে নিযুক্ত হন, তাদের জন্য আয়ারল্যান্ড সরকার ‘ক্রিটিক্যাল স্কিলস এমপ্লয়মেন্ট পারমিট’ (CSEP) জারি করে। আপনার চাকরিটি যদি নির্ধারিত ক্রিটিক্যাল স্কিলস ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বার্ষিক আয় নির্ধারিত আইনি সীমা স্পর্শ করে, তবে খুব সহজেই কাজের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা সম্ভব হয়। এই পারমিটটি মূলত সাধারণ ওয়ার্ক পারমিটের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় ও আকর্ষণীয়।
এই ক্যাটাগরিতে কাজ করার বড় সুবিধা হলো, মাত্র ২১ মাস সফলভাবে চাকরি সম্পন্ন করার পর প্রবাসীরা ‘স্ট্যাম্প ৪’ (Stamp 4) বা দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী আবাসনের জন্য আবেদন করতে পারেন। এর মাধ্যমে চাকরি পরিবর্তনের স্বাধীনতা মেলে এবং অন্যান্য সামাজিক সুযোগ-সুবিধা ইউরোপীয় নাগরিকদের মতো পাওয়ার আইনি পথ খোলে। পরবর্তীতে সব মিলিয়ে ৫ বছর আয়ারল্যান্ডে আইনি বসবাসের প্রমাণ জমা দিলে দেশটির নাগরিকত্ব বা ইউরোপীয় পাসপোর্ট অর্জনের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।
ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিন, ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিন (UCD), ডাবলিন সিটি ইউনিভার্সিটি এবং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি ডাবলিনের মতো বিশ্বখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আইটি ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অসাধারণ সব কোর্স রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বাস্তবমুখী শিক্ষা, ইন্ডাস্ট্রি প্রজেক্ট এবং সরাসরি টেক কোম্পানিগুলোর আয়োজিত ক্যারিয়ার ফেয়ারে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে পড়াশোনা শেষ করার আগেই অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী সরাসরি গুগল, অ্যামাজন বা মেটাতে ইন্টার্নশিপ ও চাকরি পেয়ে যান।
পড়াশোনাকালীন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা খণ্ডকালীন এবং সেমিস্টার বিরতির সময় ফুল-টাইম ৪০ ঘণ্টা কাজ করার অনুমতি পান। এতে আবাসন ও ব্যক্তিগত খরচের বড় একটি অংশ শিক্ষার্থীরা নিজেরাই সংগ্রহ করতে পারেন। যুক্তরাজ্যে অনিশ্চয়তার বদলে যারা ক্যারিয়ারের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এবং ইউরোপীয় জীবনযাত্রার স্থায়িত্ব খুঁজছেন, তাদের জন্য আয়ারল্যান্ডে আইটি ক্যারিয়ার গড়া নিঃসন্দেহে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।











