দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য নিয়ে শিল্প বিপ্লবের কারিগর ‘আর্টস এ মেতিয়ে’

১৭৮০ সালে ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে যখন বিশ্ব নতুন এক ভোরের অপেক্ষায় ছিল, তখনই জন্ম নেয় ‘আর্টস এ মেতিয়ে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ (Arts et Métiers)। দুইশ বছরেরও বেশি প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ইউরোপের শিল্প প্রকৌশল ও যান্ত্রিক উদ্ভাবনের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী স্তম্ভ। কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষা নয়, বরং ‘হাতে-কলমে কাজ’ করার যে সংস্কৃতি এই প্রতিষ্ঠানটি ধারণ করে, তা আজ ফ্রান্সের আধুনিক শিল্পায়নের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত।
আর্টস এ মেতিয়ে-র বিশেষত্ব হলো এর অনন্য নেটওয়ার্ক মডেল। ফ্রান্সজুড়ে এর ৮টি মূল ক্যাম্পাস এবং ৩টি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে, যা দেশটিকে একটি বিশাল ল্যাবরেটরিতে পরিণত করেছে। এখানকার শিক্ষার্থীদের বলা হয় ‘গাদজার্স’ (Gadz’Arts)—এটি এমন এক উপাধি যা কেবল মেধাকে নয়, বরং এক সুগভীর ভ্রাতৃত্ব ও পেশাদারিত্বকে নির্দেশ করে। শত বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিজেদের এক বিশেষ সংস্কৃতির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন, যা বিশ্বের খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়েই দেখা যায়।
এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হলো বাস্তবমুখী প্রকৌশলী তৈরি করা। এখানকার ল্যাবরেটরিতে পা রাখলে দেখা যায় ভারি যন্ত্রপাতি, রোবটিক্স আর্ম এবং থ্রি-ডি প্রিন্টিংয়ের সমাহার। বর্তমানের ‘ইন্ডাস্ট্রি ৪.০’ বা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের পাঠ্যক্রমকে ঢেলে সাজিয়েছে। অটোমোবাইল, এরোস্পেস এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে এখানকার গবেষকরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
আরও পড়ুনঃ পরবাসে নিজের ভাষায় বাংলাদেশি ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সহজ পথ
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নির্ভর করে কর্মক্ষেত্রে এর গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদার ওপর। এক্ষেত্রে আর্টস এ মেতিয়ে এক বিস্ময়কর নাম। ফ্রান্সের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী যেমন এয়ারবাস, রেনোঁ এবং ড্যাসো অ্যাভিয়েশনের মতো কোম্পানিগুলোতে এই প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। প্রতিষ্ঠানটির সাথে কয়েক হাজার ছোট-বড় কোম্পানির সরাসরি চুক্তি রয়েছে, যার ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার মাঝেই বাস্তব কর্মক্ষেত্রের স্বাদ পান।
গবেষণার ক্ষেত্রেও এই ইনস্টিটিউট পিছিয়ে নেই। এখানকার ১৫টি ল্যাবরেটরিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেটেরিয়াল সায়েন্স এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রসেস নিয়ে যে ধরনের কাজ হচ্ছে, তা সরাসরি বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে ‘স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং’ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রযুক্তি নিয়ে তাদের সাম্প্রতিক কাজগুলো আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যেখানে শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে, সেখানে আর্টস এ মেতিয়ে হতে পারে আমাদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রেষ্ঠ গন্তব্য। সাধারণত ফরাসি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিউশন ফি অত্যন্ত সাশ্রয়ী। ফরাসি সরকারের বিপুল ভর্তুকির কারণে বাংলাদেশি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরাও নামমাত্র খরচে বিশ্বমানের এই কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন।
স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে এখন ইংরেজি মাধ্যমে প্রচুর প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। বিশেষ করে যারা ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারিং বা এনার্জি ম্যানেজমেন্ট নিয়ে কাজ করতে চান, তাদের জন্য এর চেয়ে ভালো প্ল্যাটফর্ম খুব কমই আছে। ডিগ্রি শেষে ফ্রান্সে কিংবা সমগ্র ইউরোপে দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ বাংলাদেশি তরুণদের ক্যারিয়ারে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।











