নভেম্বর ৯, ২০২৬
#ইউরোপ #স্টুডেন্ট ভিসা

প্রকৌশল শিক্ষার আধুনিক কারিগর ফরাসি প্রযুক্তির মেরুদণ্ড ‘ইনসা’

ফ্রান্সের শিল্প বিপ্লব ও আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের নেপথ্যে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গত সাত দশক ধরে নিরবে কাজ করে যাচ্ছে, তা হলো ‘ইনস্টিটিউট ন্যাশনাল দে সায়েন্স অ্যাপ্লিক’ (Institut National des Sciences Appliquées) বা সংক্ষেপে ‘ইনসা’ (INSA)। ১৯৫৭ সালে লিওঁ শহরে প্রথম যাত্রার পর আজ এটি ফ্রান্সের বৃহত্তম এবং সফলতম প্রকৌশল শিক্ষা নেটওয়ার্ক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। সামাজিক দায়বদ্ধতা আর কারিগরি উৎকর্ষের এক অনন্য মিশেলে ইনসা বর্তমানে বৈশ্বিক প্রযুক্তির এক অপরিহার্য বাতিঘর।

ইনসা-র বিশেষত্ব হলো এর ‘ইনজেনিওর হিউম্যানিস্ট’ বা মানবিক প্রকৌশলী গড়ে তোলার দর্শন। কেবল তাত্ত্বিক সমীকরণ বা যন্ত্রের কাঠামো নিয়ে পড়ে থাকা নয়, বরং প্রযুক্তির সাথে সমাজ ও মানুষের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত—তা ইনসা-র পাঠ্যক্রমে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। এই দর্শনের কারণেই ইনসা-র গ্র্যাজুয়েটরা কেবল দক্ষ প্রকৌশলীই নন, বরং দূরদর্শী নেতৃত্ব হিসেবেও নিজেদের প্রমাণ করছেন।

বর্তমানে ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে—যেমন লিওঁ, তুলুজ, রেন, রুয়েন এবং স্ত্রাসবুর্গসহ বেশ কয়েকটি স্থানে ইনসা-র স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্যাম্পাস রয়েছে। এই নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থার ফলে শিক্ষার্থীরা এক শহর থেকে অন্য শহরের ল্যাবরেটরি বা শিল্প সংযোগের সুবিধা নিতে পারেন। এখানকার ‘ফাইভ ইয়ার ইন্টিগ্রেটেড ইঞ্জিনিয়ারিং’ মডেল শিক্ষার্থীদের উচ্চ মাধ্যমিকের পরেই সরাসরি আধুনিক গবেষণার জগতে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়।

ইনসা-র সাফল্যের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে ফ্রান্সের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর সাথে এর নিবিড় অংশীদারিত্ব। এয়ারবাস, থ্যালেস কিংবা রেনোঁ-র মতো কোম্পানিগুলো প্রতি বছর ইনসা-র শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও চাকরির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। এখানকার ল্যাবরেটরিগুলোতে বায়োটেকনোলজি, ন্যানোটেকনোলজি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে এমন সব গবেষণা চলছে, যা সরাসরি ফরাসি অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ স্বপ্নের আড়ালে দীর্ঘশ্বাস: প্রবাস জীবনের অজানা সংগ্রামের গল্প

র‍্যাঙ্কিংয়ের বিচারে, বিশেষ করে নিয়োগকর্তাদের পছন্দের তালিকায় ইনসা নিয়মিতভাবে ফ্রান্সের শীর্ষ তিনটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অবস্থান করে। তাদের ‘ইন্টারন্যাশনাল সেকশন’ বিশ্বজুড়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করছে, যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতির মিশেলে উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ ঘটে।

একনজরে ‘ইনসা’ (INSA) নেটওয়ার্ক:

  • প্রতিষ্ঠাকাল: ১৯৫৭ সাল (প্রথম ক্যাম্পাস লিওঁ-তে)।

  • ক্যাম্পাস সংখ্যা: ফ্রান্সজুড়ে ৭টি মূল ক্যাম্পাস এবং বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান।

  • শিক্ষার্থী সংখ্যা: প্রায় ২০,০০০-এর বেশি সক্রিয় শিক্ষার্থী এবং ১ লাখের বেশি অ্যালামনাই।

  • বিশেষত্ব: মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন প্রকৌশলী তৈরিতে ইউরোপের পথিকৃৎ।

  • শিল্প সংযোগ: ১,২০০-এর বেশি আন্তর্জাতিক কোম্পানির সাথে সরাসরি শিক্ষা ও গবেষণা চুক্তি।

  • গবেষণা: ৪৫০টির বেশি পিএইচডি থিসিস এবং শত শত পেটেন্ট প্রতি বছর ইনসা নেটওয়ার্ক থেকে প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশের উদীয়মান তরুণ যারা রোবোটিক্স, তথ্যপ্রযুক্তি কিংবা পরিবেশ প্রকৌশল নিয়ে বিশ্বমানের শিক্ষা নিতে চান, তাদের জন্য ইনসা হতে পারে সেরা গন্তব্য। ফরাসি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় এখানে টিউশন ফি অত্যন্ত সাশ্রয়ী। ফরাসি সরকারের ভর্তুকি সুবিধার কারণে বিদেশি শিক্ষার্থীরাও নামমাত্র খরচে এই মানের উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পান।

স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অনেক কোর্স এখন ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত হচ্ছে, যা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় সুবিধা। এছাড়া ইনসা-র ক্যাম্পাসগুলোতে থাকা আবাসন ব্যবস্থা ও প্রাণবন্ত সামাজিক পরিবেশ নতুন শিক্ষার্থীদের খুব দ্রুত বিদেশের মাটিতেও দেশের আমেজ দেয়।

প্রকৌশল শিক্ষার আধুনিক কারিগর ফরাসি প্রযুক্তির মেরুদণ্ড ‘ইনসা’

ফরাসি মেধার ‘দুর্গ’ ইকোল পলিটেকনিক

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *