নভেম্বর ৯, ২০২৬
#মধ্যপ্রাচ্য #সংযুক্ত আরব আমিরাত #সৌদি আরব

দুবাই ও সৌদিতে গোল্ডেন ভিসা সুবিধা পাচ্ছেন প্রবাসীরা, বদলে যাচ্ছে আবাসন চিত্র

মধ্যপ্রাচ্যের দুই শীর্ষ অর্থনৈতিক পরাশক্তি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে প্রবাসীদের জন্য গোল্ডেন ভিসা সুবিধা লাভ করা এখন আর কোনো অধরা স্বপ্ন নয়। ঐতিহ্যবাহী কফিল প্রথার দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা এড়িয়ে নিজস্ব মেধা, ব্যবসা ও মূলধনের যোগ্যতায় প্রবাসীরা এখন ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাধীন আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন। এই যুগান্তকারী পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবী ও বিনিয়োগকারীদের জীবনযাত্রায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসকারী প্রবাসীদের কাছে এতদিন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার বিষয় ছিল স্থানীয় কফিল বা স্পন্সরের ওপর একক নির্ভরতা। যেকোনো সময়ে চাকরি হারানো কিংবা কফিলের সাথে দ্বন্দ্বে পড়লে তড়িঘড়ি করে দেশ ছাড়ার আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াতো সাধারণ কর্মীদের। তবে আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতির সাথে তাল মেলাতে এবং আন্তর্জাতিক মেধা আকর্ষণের লক্ষ্যেই কালজয়ী এই নীতিতে ব্যাপক সংশোধন এনেছে দেশগুলো।

প্রথাগত আইনি বাধা দূর করে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন ব্যবস্থা চালুর ফলে প্রবাসীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন। চাকরি পরিবর্তন কিংবা নতুন ব্যবসা চালু করতে আর কফিলের অনাপত্তিপত্র বা নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (NOC) সংগ্রহ করতে হয় না। কাজের স্বাধীন পরিবেশ তৈরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে থাকা হাজার হাজার সফল প্রবাসী উদ্যোক্তা এখন গালফ দেশগুলোতে স্বাচ্ছন্দ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত বা দুবাই বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও মেধাবীদের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দেশটিতে গোল্ডেন ভিসা পাওয়ার জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়েছে। রিয়েল এস্টেট খাতে প্রায় ২০ লাখ দিরহাম সমমানের সম্পত্তি ক্রয় করলে পাঁচ বা ১০ বছরের আবাসন সুবিধা পাওয়া যায়। এ ছাড়া বিশিষ্ট বিনিয়োগকারী, স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা এবং উচ্চ বেতনের শীর্ষ করপোরেট নির্বাহীরাও সহজে এই ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রাখা ব্যক্তিদের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশেষ কোটায় এই মেয়াদ বাড়ায়। কেবল আবাসন সুবিধা দেওয়াই নয়, গোল্ডেন ভিসাধারীরা টানা ছয় মাসের বেশি সময় দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তাদের ভিসার বৈধতা বাতিল হয় না। এই শিথিলতা বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ব্যবসা পরিচালনা করা বাংলাদেশিদের জন্য বিরাট এক আশীর্বাদ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

সৌদি আরবের মহামান্য ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে চালু করা হয়েছে বিশেষ প্রিমিয়াম রেসিডেন্সি। এটি বস্তুত সৌদি সংস্করণের গোল্ডেন ভিসা নামে পরিচিত। এর আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগ করে কিংবা বিশেষ দক্ষতা প্রদর্শন করে বাংলাদেশিসহ যেকোনো বিদেশি নাগরিক সৌদি আরবে কফিল ছাড়া বসবাসের আইনি অনুমতি পাচ্ছেন।

এই প্রিমিয়াম রেসিডেন্সির মূল আকর্ষণ হলো, সৌদিতে এখন নিজস্ব নামে বাণিজ্যিক বা আবাসিক জমি ও বাড়ি কেনা সম্ভব হচ্ছে। আগে যেকোনো ব্যবসা দাঁড় করাতে সৌদি নাগরিককে ৫১ শতাংশের ভুয়া বা প্রকৃত মালিক বানিয়ে কমিশন দিতে হতো। বর্তমানে বিদেশি উদ্যোক্তারা ১০০% সরাসরি মালিকানায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দেশটির বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার দখলের প্রতিযোগিতা করছেন।

দুবাই ও সৌদির এই আধুনিক ভিসা নীতি বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে বছরের পর বছর ব্যবসা করে উপার্জিত অর্থ নিজ দেশে পাঠাতে হলেও আইনি নিরাপত্তার অভাবে স্থায়ী সম্পদ সেখানে গড়া সম্ভব হতো না। বর্তমানে অনেকেই দুবাইয়ের আবাসন খাতে বিনিয়োগ করে বা টেক-স্টার্টআপ তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন নিশ্চিত করছেন।

আমাদের দেশের অনেক অভিজ্ঞ চিকিৎসক, আইটি বিশেষজ্ঞ এবং প্রকৌশলীও মেধার সনদের ওপর ভর করে গোল্ডেন ভিসার প্রাথমিক অনুমোদন হাসিল করছেন। এতে একদিকে যেমন প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ঠিক একইভাবে প্রবাসীদের মাধ্যমে বাংলাদেশে বৈশ্বিক বিনিয়োগ এবং আধুনিক রেমিট্যান্স আসার পথ আরও সুগম হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের মধ্যে এখন আন্তর্জাতিক মেধা ও অর্থ আকৃষ্ট করার এক সুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তেলনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তি নির্ভর সমাজ গঠনের লক্ষ্যে তারা এই পথ বেছে নিয়েছে। ভবিষ্যতে সাধারণ শ্রমিকদের বাইরেও উচ্চমানের প্রফেশনাল ও ধনকুবের প্রবাসীদের প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠবে দুবাই ও রিয়াদ।

পেশাদার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, যারা এই সুযোগ নিতে চান তাদের শুরুতেই কাগজপত্র এবং আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা উচিত। যেকোনো ভুয়া এজেন্ট বা মধ্যস্বত্বভোগীর প্রলোভনে না পড়ে অফিশিয়াল সরকারি পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা শ্রেয়। আইনি নিয়ম মেনে চললে খুব সহজেই বৈশ্বিক এই নাগরিক সুবিধা অর্জন করে স্থায়ী ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *